Image description

ঢাকার মিরপুরে সাত বছরের এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক প্রভাবশালী সংগঠন হেফাজতে ইসলামও সরব হয়েছে। তবে সংগঠনটির এই প্রতিবাদ যে কেবল বেছে বেছে করা হয়, তা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মিরপুরের ঘটনার মাত্র একদিন পরেই ঢাকার বনশ্রীর একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেছে, এই শিশুটিও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তবে এই ঘটনায় সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে হেফাজতে ইসলাম।

কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন কওমি ধারার ভেতরে থাকা কয়েকজন সংস্কারপন্থী আলেম এ বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

তবে কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণকারী বোর্ড সাংবাদিকদের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত এ বিষয়ে চুপ থাকে। আর কথা বললেও তারা নিজেদের দায় এড়ানোর এবং দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে।

মিরপুরের ঘটনা নিয়ে হেফাজত আন্দোলন করলেও বনশ্রীর ট্র্যাজেডি কেন এড়িয়ে গেল-এমন প্রশ্নের জবাবে হেফাজতের নায়েবে আমির ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব মাহফুজুল হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেকোনো ঘটনা ঘটলেই কাউকে না কাউকে অপরাধী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। তবে আমাদের আগে খুঁজে বের করতে হবে অপরাধটি কে করেছে। এরপর আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।’

কিন্তু দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের তৎপরতার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। মিরপুর হত্যাকাণ্ডের চার দিন পর, ২৩ মে হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব শেখ সাজিদুর রহমান একটি যৌথ বিবৃতি দেন। সেখানে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে চিন্তিত ও আতঙ্কিত করেছে।’ তারা এই অপরাধ বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অথচ সেই বিবৃতিতে বনশ্রীর শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে একটি শব্দও ছিল না।

এই বিলম্বের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মাহফুজুল হক জানান, হেফাজত এবং বেফাক উভয় সংস্থাই বনশ্রীর ঘটনাটি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে। তিনি বলেন, ‘নিহত শিশুটি ওই মাদ্রাসার ছাত্র এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সাবেক ছাত্র। সব তথ্য পাওয়ার পর এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।’

জরুরি সংস্কারের আহ্বান আলেমের

কওমি ধারার এই নীরবতা ভেঙে সিলেটের বিয়ানীবাজারের আতহারুল উলুম আদিনাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম রুহুল আমিন সাদী প্রকাশ্যে এই অভিযোগগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কওমি মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে আর আত্মতুষ্টি বা চুপ করে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন পরিচালকের সদিচ্ছার অভাব ও অযোগ্যতার কারণে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করা যাবে না।

টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে পাঠানো এক লিখিত বিবৃতিতে মাওলানা সাদী কওমি মাদ্রাসাগুলোর শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে ১০ দফার একটি সমন্বিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বাড়াতে তিনি পুরো মাদ্রাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখতে নামহীন অভিযোগ বক্স চালুর পরামর্শ দেন।

এর পাশাপাশি তিনি প্রতি তিন মাস পর পর অভিভাবক-শিক্ষক সভা, প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পর পর নিরাপত্তা সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক স্খলন রোধে প্রবীণ আলেমদের মাধ্যমে নিয়মিত হেদায়েতি মজলিশের আয়োজন করার আহ্বান জানান। শিক্ষকদের জন্য তিনি সাপ্তাহিক আত্মমূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তাব করেন।

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার বাইরেও মাওলানা সাদী কওমি বোর্ড বেফাকের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানান।

শিক্ষকদের উপযুক্ত মজুরি এবং পর্যাপ্ত ছুটি নিশ্চিত করার জন্য তিনি একটি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো বা শ্রম সংস্কারের পক্ষে মত দেন।

নজরদারি বাড়াতে তিনি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সব মাদ্রাসার জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং শিক্ষকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির দাবি জানান, যেখানে যৌন নিপীড়নে দোষী সাব্যস্ত যে কারোর নাম কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, অভিভাবক এবং স্থানীয় সমাজকেও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকতে হবে। ছুটি চলাকালীন মা-বাবাদের তাদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মাদ্রাসাকে কেবল দায়িত্ব এড়ানোর জায়গা ভাবলে চলবে না।

তবে মাওলানা সাদী সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন কঠোর আইনি ব্যবস্থার ওপর। লোকলজ্জার ভয়ে বা মাদ্রাসার সম্মান বাঁচাতে ভেতরে ভেতরে আপস করার যে ঐতিহ্যবাহী চর্চা রয়েছে, তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি যুক্তি দেন, মাদ্রাসার ভেতরে যদি ধর্ষণ বা কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানের দোহাই দিয়ে তা কখনোই ধামাচাপা দেওয়া বা স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে রফা করা যাবে না, বরং অপরাধীদের সরাসরি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় পোশাক বা সামাজিক মর্যাদা যেন কাউকে ন্যায়বিচার থেকে আড়াল করতে না পারে।

মাওলানা সাদী বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক না কেন, দাড়ি, টুপি বা আলেম হিসেবে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। ইসলাম অনুযায়ী, পরহেজগারির পাশাপাশি শাস্তির ভয়ও থাকতে হবে। আলেম সমাজকেই প্রথমে এই বিষয়ে আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে একজন পাপী মানুষের কারণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।’

তার মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশি অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। এর জন্য দরকার কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষতা এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি।

জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ ওঠার পর কওমি বোর্ড কী পদক্ষেপ নেয় জানতে চাইলে মাহফুজুল হক দাবি করেন, ধর্ষণের অভিযোগ তদন্তের জন্য সংস্থাটি একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। বনশ্রীর ঘটনার জন্যও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

তবে তার এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন শিশু ধর্ষণ হওয়া মাদ্রাসা আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসার পরিচালক ও চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো তদন্ত কমিটি আসেনি।’

কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের অতীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এই অস্পষ্টতা আরও ঘনীভূত হয়। নিয়ম না মানা কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বোর্ড কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কি না জানতে চাইলে মাহফুজুল হক কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে উত্তর দেন, ‘আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসার নিবন্ধন বাতিল করেছি।’

তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এটি ‘সময়ে সময়ে’ হয়েছে এবং সঠিক সংখ্যাটি এই মুহূর্তে ‘বলা সম্ভব নয়।’ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে এমন একটি মাদ্রাসার নাম বলতে বলা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘নথিপত্র না দেখে এটি বলা যাবে না।’

স্বচ্ছতার এই অভাবের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগ্রহ করা তথ্যেরও গড়মিল বিশাল। আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, প্রকৃত সংখ্যাটি সম্ভবত আরও অনেক বেশি। কারণ, এই ধরনের সিংহভাগ ঘটনাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ধামাচাপা দেওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে মিটমাট করে ফেলা হয়।