Image description

নির্দিষ্ট গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে চালু হয়েছিল আন্তঃনগর ট্রেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়ছে দেশের রেলব্যবস্থা। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনতুষ্টি কিংবা ব্যক্তিগত কৃতিত্ব জাহিরে মরিয়া মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) বা আমলারা। তাদের তদবিরে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বহীন স্টেশনেও দেওয়া হচ্ছে দ্রুতগামী ট্রেনের যাত্রাবিরতি (স্টপেজ)।

যার জেরে ঠিক থাকছে না ট্রেনের শিডিউল, বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি, নষ্ট হচ্ছে সময়। শুধু তাই নয়, ঘন ঘন ট্রেন থামার কারণে বাড়ছে রেলওয়ের জ্বালানি ব্যয়ও। যা রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের বোঝা করছে আরও ভারী।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলের উন্নয়নে রয়েছে ৩০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান। তবে যখন যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তখন সেই দলের প্রভাবশালী নেতারা রেলের সেই গবেষণানির্ভর পরিকল্পনাকে দেখাচ্ছেন বৃদ্ধাঙ্গুলি। যেমন— লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম সম্প্রতি তার নির্বাচনী এলাকায় নতুন রেলপথ স্থাপনের আবেদন করেছেন। কোনো বাণিজ্যিক গুরুত্ব বা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই তোলা হয়েছে এ দাবি।

অনুরূপভাবে, নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের জন্য সম্প্রতি রেলের প্রতিনিধিদল নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এতে স্থানীয়দের মনেও তৈরি হয়েছে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা।

যদিও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এমন প্রকল্প সরকারের আর্থিক বোঝা আরও বাড়াবে।

রাজনৈতিক প্রভাবে ট্রেনের স্টপেজ নির্ধারণের বড় উদাহরণ রাজবাড়ীর পাংশা। সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের সময়ে তার নিজ উপজেলা পাংশায় কার্যকর হয় একাধিক আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি। আর সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর প্রভাবে পাশের উপজেলা কুষ্টিয়ার খোকসায় বেনাপোল এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতি দেওয়া হয় বলে রয়েছে জনশ্রুতি।

নিজের নির্বাচনী এলাকায় নতুন রেললাইন স্থাপনে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর গত ২৮ এপ্রিল আবেদন করেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের হাজীগঞ্জ থেকে রামগঞ্জ-লক্ষ্মীপুর-চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তার দাবি, রেললাইনটি স্থাপন হলে উপকৃত হবে ওই অঞ্চলের প্রায় ১৮ লাখ মানুষ।

রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রামের সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে বলেও উল্লেখ করা হয় আবেদনে। যদিও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বা প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই এই দাবি তুলেছেন এমপি সেলিম।

অভিযোগ উঠেছে, বাণিজ্যিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিবেচনা না করেই নতুন রেলপথ স্থাপনের আবেদন করেছেন এই এমপি। নতুন রেললাইনটির সম্ভাব্য ব্যয়, যাত্রীর চাহিদা ও আর্থিক লাভ-ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।

নিজের এলাকায় নতুন রেলপথ স্থাপনের আবেদনের যৌক্তিকতার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল সংসদ সদস্য শাহাদত হোসেন সেলিমের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘রেলপথে ঢাকার সঙ্গে আমাদের লক্ষ্মীপুর জেলার সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই। একটা জেলা দেশের রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত সময়ে যোগাযোগ করতে পারে না। তাই আমি আমার জেলার ওপর দিয়ে একটি রেললাইন স্থাপনের আবেদন করেছি। রেললাইনটা হয়ে গেলে আমার জেলার রামগঞ্জ থেকে চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত যত মানুষ আছে, সবাই উপকৃত হবে। ঢাকায় ব্যবসা করতে পারবে অনেকে ব্যবসায়ী।’

রেললাইন স্থাপনে যে ব্যয় হবে, সেটি এই রেললাইন থেকে আনুমানিক কতদিনে তোলা যাবে— জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন সেলিমের ভাষ্য, ‘যেকোনো রেললাইন স্থাপন করলে এটার খরচের সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করতে প্রায় ২০ বছরের মতো লাগে, সে ক্ষেত্রে আমাদেরটাও তেমন সময়ই লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে খরচ কমাতে কর্তৃপক্ষ আমদের পুরাতন রেলও দিতে পারে। কিন্তু আমরা আশা করছি, যাতে নতুন রেল পাই। নতুন রেল দিলে আমাদের সবার জন্যই ভালো হবে।’

একইভাবে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণে আশার আলো দেখাচ্ছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলা পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদল। এ সফরকে ঘিরে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তৈরি হয় বিস্তর প্রত্যাশার।

এর আগেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে রাজনৈতিক প্রভাবে নতুন স্টপেজ নির্ধারণের। সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের সময়ে রাজবাড়ীর পাংশায় চালু হয় একাধিক আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি। অথচ পাশের জেলা কুষ্টিয়ার কুমারখালী বাণ্যিজিক ও পর্যটনের দিক থেকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পায়নি একই সুবিধা। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ওই এলাকার মানুষদের।

কুমারখালীতে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে রাজবাড়ী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের উপজেলা পাংশায় কার্যকর হয় সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতি। একইভাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর প্রভাবে তার নিজ উপজেলা কুষ্টিয়ার খোকসায় যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা হয় বেনাপোল এক্সপ্রেসের। এটি পাংশার আগের স্টেশন।

স্থানীয়দের দাবি, যাতায়াত ও বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কুমারখালীতে এখনো থামে না কোনো আন্তঃনগর ট্রেন। ফলে যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে যেতে হয় ১৬ কিলোমিটার দূরের কুষ্টিয়া বা ১০ কিলোমিটার দূরের খোকসায়, যা তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কুমারখালীর তাঁত কাপড়ের হাট দেশের অন্যতম বৃহত্তম কাপড়ের হাট হলেও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এটি পরিণত হতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে।

গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট শাকিল আহমেদ তিয়াস কুমারখালীকে একটি প্রাচীন ও শিল্পসমৃদ্ধ শহর বলে উল্লেখ করেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, সেখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি। এটি শুধু যাতায়াতের বিষয় নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত।

নতুন স্টপেজ যুক্ত হলে যাত্রাসময়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে— তা জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কাছে। তার মতে, নতুন কোনো স্টপেজ যুক্ত হলে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট বেশি।

জনপ্রতিনিধিরা সাধারণত তাদের এলাকায় ট্রেনের স্টপেজ চান জানিয়ে তিনি বললেন, স্টপেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীসংখ্যা, সম্ভাব্য আয় এবং পরিচালন ব্যয়— সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। এ ছাড়া ঘন ঘন ট্রেন থামলে জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যায়।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীচাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া নতুন স্টপেজ বা রেলপথ বাড়ানো হলে রেলের পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ হতে পারে যাত্রার সময়ও। এমন প্রেক্ষাপটে অবশ্যই রেললাইন স্থাপনের আগে ভেবে দেখতে হবে, সেটি আদৌ লাভজনক হবে কি না।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন দপ্তরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্য বলছে, লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ রয়েছে দেশের ৫৮টি রেলস্টেশন। রেল কর্মকর্তা ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন রেললাইন নির্মাণ বা স্টপেজ বাড়ানোর আগে প্রয়োজন বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামানের মতে, নতুন রেললাইন স্থাপন বা ট্রেনের যাত্রাবিরতি কার্যকরের ক্ষেত্রে ৩০ বছরের যে মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ করা উচিত। তিনি বললেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং মাস্টারপ্ল্যান না দেখে যদি রেললাইন বসানো হয়, তাহলে পরে সেটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার রাজনৈতিক ব্যবহার করা যাবে না। প্রকল্প নেওয়ার আগে দেখতে হবে যে সেটি মাস্টারপ্ল্যানে আছে কি না। তারপর রাজনৈতিক দিকেরটা আগে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানে নেই, এমন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে যেগুলো আছে, সেগুলো আগে করা উচিত। কারণ, একটি মাস্টারপ্ল্যান সাধারণত অনেক গবেষণা বিবেচনা করেই তৈরি করা হয়। শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক বিবেচনা না করে রেললাইন বসানো উচিত নয়।



• প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন কুষ্টিয়া প্রতিনিধি কাজী সাইফুল