Image description

পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে সালফিউরিক অ্যাসিড আছে পর্যাপ্ত। এরপরও বাজারে চলছে একরকম কৃত্রিম সংকট। আর এ সুযোগে কয়েকগুণ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অসাধু সিন্ডিকেট। ৩০ হাজার টাকার প্রতি টন সালফিউরিক অ্যাসিড বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায়। এভাবে গত দেড় মাসে ক্রেতাদের পকেট কেটে ৫৬৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছে ওই  চক্রটি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে— এমন অজুহাত তাদের।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক পথ বন্ধের আগেই সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের কাঁচামাল সালফার দেশে মজুদ করেছিলেন বেসরকারি উৎপাদনকারীদের কয়েকজন। অন্যদিকে সরকারিভাবে সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড সাত মাস ধরে বন্ধ থাকার পরও বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। কারণ এই প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদিত অ্যাসিডের সিংহভাগ সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় দেওয়া হয়। আর বাকিটুকু সরবরাহ করা হয় স্থানীয় বাজারে।

বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারি উৎপাদন ফের চালু করতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ১৫ হাজার টন সালফার আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। এটি অনুমোদনের জন্য গত ২৯ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে; ‍কিন্তু এখনো আসেনি কোনো কার্যকর ফল। মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়াসাপেক্ষে প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। কালক্ষেপণের নেপথ্যে ওই সিন্ডিকেটের হাত থাকতে পারে—এমন শঙ্কা অনেকের। তাদের মতে, সালফিউরিক অ্যাসিডের চড়া মূল্যের প্রভাব পড়েছে দেশের চামড়া, ব্যাটারি, রাসায়নিক সার, দেশলাই, ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে। এ ছাড়া তেল শোধন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জানতে চাইলে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে শিগগির সম্মতি দেওয়া হবে।’

জানা গেছে, দেশে বছরে সালফিউরিক অ্যাসিডের চাহিদা ২ থেকে আড়াই লাখ টন। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টন সালফিউরিক অ্যাসিড সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে থাকে। টিএসপির বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদকরাও দাম নির্ধারণ করে। সালফারের অভাব ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন প্ল্যান্টও বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় মাসে উল্লিখিত সিন্ডিকেট সাড়ে পাঁচশ কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে গত ৮ এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সালফার আনা যাচ্ছে না। এ দোহাই দিয়ে হঠাৎ করে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম ৩০ হাজার থেকে লাফ দিয়ে আড়াই লাখ টাকা হয়। বর্তমানে তা কিছুটা কমলেও দুই লাখের ওপরে রয়েছে। সেই হিসাবে বছরে চাহিদা দুই লাখ টন হলে প্রতিদিন দরকার ৫৪৭ টন। এতে প্রতি টনে দাম বেড়েছে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। ফলে ৫৪৭ টনে অতিরিক্ত মুনাফা হয়েছে ১২ কোটি ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে গত ৪৭ দিনে এই সিন্ডিকেট মুনাফা করেছে অন্তত ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানালেন, বেসরকারি উৎপাদনকারীরা হরমুজ প্রণালির দোহাই দিয়ে সালফারের চড়া দাম জায়েজ করার চেষ্টা করলেও তা সঠিক নয়। তার মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সালফারের দাম চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মার্কিন ডলার। প্রতি টন সালফারে ৩ টন সালফিউরিক অ্যাসিড হয়। সে হিসাবে প্রতি টন সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন করতে বর্তমানে মাত্র ৩০০ ডলারের সালফার প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ ২০ শতাংশ এবং লাভ বাবদ ২০ শতাংশ যোগ করলেও প্রতি টন অ্যাসিডের দাম ৪২০ ডলার বা ৫১ হাজার ৬৬০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে প্রতি টন বিক্রি হচ্ছে পাঁচ গুণ বেশি দামে। এই সিন্ডিকেটে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলেও মন্তব্য ওই কর্মকর্তার।