‘আব্বু, গরুটা একদম গোট (জিওএটি), নো ক্যাপ’– কোরবানির পশুর হাটে ছেলের মুখে শব্দগুলো শুনে নওশাদ আলমের (৪৮) ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। মনে উঁকি দিচ্ছে, গরু আবার ছাগল (গোট) হয় কী করে? এখানে টুপিই (ক্যাপ) বা কেন আসল?
জেন জি বা জেনারেশন জেডের (১৯৯৭-২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া) এমন ভাষা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে ভিনগ্রহের লাগছে। মা-বাবা এবং সন্তানদের মধ্যে যোগাযোগের এই শূন্যতা (জেনারেশন গ্যাপ) এখন ঘরে ঘরে। ভাষাতাত্ত্বিকরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের ভাবনাকে ‘ভাষা বিকৃতি’ বলার সুযোগ নেই। বরং এটি নিয়ে আরও বোঝাপড়া দরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পত্রিকা ‘মাতৃভাষা’– এর ‘জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫’ সংখ্যায় ‘জেন জি–এর ভাষা: একটি তত্ত্বীয় পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘জেন জি’র ডিজিটাল ভাষাচর্চা কোনোভাবেই ভাষার অবক্ষয় বা বিকৃতি নয়। বরং এটি ভাষার এক যুগান্তকারী বিবর্তন, যেখানে ব্যাকরণের চেয়ে আবেগ ও দ্রুত যোগাযোগই মুখ্য। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ‘ডিজিটাল স্ল্যাং ও ইমোজিভিত্তিক যোগাযোগ’ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ এসেছে গবেষণা প্রবন্ধে।
প্রবন্ধটির রচয়িতা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা নাহিদ বলেন, ‘জেন জিরা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাইন ল্যাংগুয়েজ দিয়ে নিজেদের আলাদা একটি পরিচয় বা সত্তা প্রমাণ করতে পেরেছে, যেটি আগের কোনো প্রজন্ম সেভাবে পারেনি। ফলে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে তাদের একটি বিশাল কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। মূলত সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কালচার থেকে এই ভাষার চল হলেও, এখন তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।’
বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা জেন জি’র ‘পুকি’
আগে সাহিত্যে একটি দৃশ্য বা অনুভূতি বোঝাতে লেখকেরা দীর্ঘ বাক্যের আশ্রয় নিতেন। যেমন– বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে সমুদ্রতীরে দাঁড়ানো কপালকুণ্ডলার সৌন্দর্য বর্ণনায় নবকুমারের মুখ দিয়ে বলেছেন, ‘অবেণীসম্বদ্ধ, সংসর্পিত, রাশীকৃত, আগুল্ফলম্বিত কেশদাম; তদগ্রে দেহরতন যেন চিত্রপটের উপর চিত্রিত দেখা যাইতেছে।’
বড় বাক্য পড়ে আগের প্রজন্ম মুগ্ধ হলেও, জেন জি’র এত সময় নেই। তারা বঙ্কিমের এই পুরো দৃশ্যপটকে হয়তো এক বা দুই শব্দে বুঝিয়ে দেবে। এমন নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায় তারা হয়তো বলবে, ‘শি ইজ আ ব্যাডি (baddie)’, ‘কিউট একটা পুকি (pookie)!’ অথবা শুধু একটি ???? বা ???? ইমোজি দিয়ে ষোলো আনা প্রকাশ করবে।
নাহিদা নাহিদের ব্যাখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা দিন দিন আরও সহজ হচ্ছে। মানুষ এখন অপ্রয়োজনে সময় নষ্ট করতে চায় না। তারা যতটুকু সময় পায়, বিনোদনে ব্যয় করতে চায়। তাই তারা শব্দ বা ভাষার পেছনে বেশি সময় খরচ না করে কনটেন্ট বা ইমোজি দিয়ে নিজের প্রকাশ করছে। ফলে ভাষা দিন দিন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে। প্রকৃতি পরিবর্তন হচ্ছে, মানুষ পরিবর্তন হচ্ছে, মানুষের সাইকোলজিরও পরিবর্তন ঘটছে। তাহলে ভাষা কেন বদলাবে না, প্রশ্ন এই সহযোগী অধ্যাপকের।
আগের প্রজন্ম যেখানে বিরামচিহ্নকে কেবল যতিচিহ্ন ভাবেন, জেন জি’র কাছে তা ভিন্ন। তাদের ভাষায়, ‘...’ মানে সাসপেন্স বা ‘তুই?’, ‘??’ মানে বিস্ময় বা ‘সত্যি’, ‘!!’ বা ‘!!!’ মানে উত্তেজনা বা ‘হায়রে’, ‘?!’ বা ‘!?’ মানে বিভ্রান্তি বা ‘কী?’, আর ‘~’ মানে মায়াবী।
আবেগে ধরাশায়ী ব্যাকরণ
গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, জেন জি ব্যাকরণের নিয়মের চেয়ে অনুভূতি প্রকাশে বেশি জোর দেয়। টেক্সট মেসেজে তারা কণ্ঠস্বরের ওঠানামা বোঝাতে শব্দের আকার পরিবর্তন করে। যেমন— তারা লেখে ‘Sooooo Sad’ বা ‘WHY???’। বড় হাতের অক্ষর বা বারবার একই অক্ষর লেখার মানে হলো তারা চিৎকার করছে বা জোর দিচ্ছে। উচ্চারণের ক্ষেত্রেও তারা বেশ স্বাধীন। ‘নো ক্যাপ’ হচ্ছে নোক্যাপ, ‘সেম হিয়ার’ সেমিয়ার, ‘ডেড ইনসাইড’ হচ্ছে ডেডিনসাইড।
শব্দ জোগের খেলা ও বিপরীত অর্থ
গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, জেন জি’রা দুটি শব্দ মিলিয়ে নতুন শব্দ তৈরিতেও ওস্তাদ। ‘Girl’ ও ‘Boss’ মিলে ‘Girlboss’, ‘Fake’ ও ‘Instagram’ জুড়ে ‘Finsta’ (ঘনিষ্ঠদের জন্য গোপন আইডি), ‘Hungry’ ও ‘Angry’ মিলে ‘Hangry’ (ক্ষুধায় মেজাজ খারাপ)।
আগে যে ‘cool’ ঠান্ডা ছিল, এখন তা ‘dull (মলিন)’। based মানে যুক্তি আছে। এর বিপরীতে তারা বলে ‘cringe’ বা ‘biased’। ‘energy’-এর বিপরীত ‘boring’. ‘low-key’ মানে গোপন বা সূক্ষ্ম (যেমন– আমি লো-কি এই জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছি)। আর ‘high-key’ মানে উত্তেজিত (হাই-কি, সিনেমাটা আসলেই অনেক ভয়ংকর ছিল)।
গবেষণায় নাহিদা নাহিদ দেখিয়েছেন, জেন জি’র ভাষাকে নেতিবাচক ‘অবক্ষয়’ না দেখে, ডিজিটাল যুগের উপযোগী স্বতন্ত্র ভাষিক সত্তা হিসেবে গ্রহণ করাই যৌক্তিক। প্রচলিত ব্যাকরণবিদদের উচিত এই ডিজিটাল ভাষাকে মেনে নিয়ে প্রমিতকরণের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হওয়া। ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য ডিজিটাল অভিধান তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।