বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। বিশ্বকাপ উম্মাদনায় ক্রীড়ামোদিদের আগ্রহ, সমর্থন, নিজ পছন্দের দলের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন ও রাত জেগে খেলা উপভোগ করা চিরচেনা এক আবহ সৃষ্টি হয়।
বিশেষত বিশ্বকাপ ফুটবল আসলে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ফেভারিট দলের সমর্থক সারা বিশ্বে রয়েছে। বিশেষত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থক বাংলাদেশে বেশুমার।
সমর্থকদলের পতাকা উড়বে বাড়ি, অফিস, দোকানপাট এমনকি রাস্তার দুই ধারে। ক্রীড়াপ্রেমী আর্জেন্টিনা দল পাগল দাগনভূঞার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের মতিন প্রিয়দলের পতাকা উড়াতে গিয়ে চিরতরে হারিয়েছেন নিজের দুই হাত দুই পা।
চিরতরে হাতপা হারানো মতিনের তারপরও উৎসাহ-উদ্দীপনার এখনও ঘাটতি দেখা দেয়নি। শুধু স্বপ্ন আছে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ গ্যালারিতে বসে প্রিয়দল আর্জেন্টিনার খেলা দেখার। তবে বিগত আসরে প্রথম পর্বে আর্জেন্টিনার পরাজয়ে আক্ষেপের শেষ ছিল না পঙ্গু মতিনের। শেষাবধিও বুকে আশা বেঁধে ছিল আগত খেলাগুলোতে জয়েরমালা নিয়ে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ান হবেই হবে।
বিশ্বব্যাপী শহরে বন্দরে নগরে গ্রামে উড়ছে নানা দেশের পতাকা, গায়ে গায়ে জার্সি। খেলা দেখার এই উন্মাদনা কখনো ছাড়িয়ে যায় পাগলামোতেও। আবার কখনো এই উন্মাদনাই বিপদ ডেকে আনে কারও কারও জীবনে। তেমন এক দুর্ঘটনার কবলে আবদুল মতিন। তার বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলা সিন্দুরপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা উড়াতে গিয়ে চিরতরে হারিয়েছেন নিজের হাত-পা উভয়ই।
পরিশ্রমী, কর্মঠ মতিনের ছিলো সাজানো গোছানো ব্যবসা। সুস্থ-সুন্দর শারীরিক গঠনাকৃতির মতিনের এখন কিছুই নেই। বেঁচে আছেন আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সাহায্য সহযোগীতায়। এত কিছুর পরেও কমেনি ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহ। আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসারও এখনো কোন ঘাটতি নেই। তবে তার অনুরোধ, ফুটবল উন্মাদনায় এমন কিছু যেন না হয়। যার রেশ টানতে হবে সারা জীবন।
২০১৪ সালের মার্চ মাসের ২৮ তারিখ। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগের ঘটনা। মতিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুর শহরের আজিম শাহ মার্কেটের তিন তলা ছাদের উপরে এলমুনিয়াম রডের মাধ্যমে পতাকা টানাতে গিয়ে হঠাৎ বিদ্যুতের প্রধান সঞ্চালন লাইনের সাথে লেগে যায় এলমুনিয়ামের রডটি। মূহুর্তেই ছিটকে পড়ে একটি দেয়ালের উপর। আর হুশ ছিলো না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করে মতিনকে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটে। আইসিইউতে রাখা হয়েছিল ২৭ দিন। সাড়ে তিন মাস চিকিৎসা চলছে। ইনফেকশান হয়ে যাওয়ায় হাত-পা গুলোকে রক্ষা করা যায়নি কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। পুরো চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে ৭-৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ব্যবসা, দোকান সব শেষ হয়েছে। সব হারিয়ে একদম শূন।
মতিন বলেন, নিজের পছন্দের দলের প্রতি উন্মাদনা দেখাতে গিয়ে আজ আমি সব হারা। বেশি কিছু স্বপ্ন নাই। গ্যালারিতে বসে প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে চাই। মেসিদের একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই। আমি চাই একদিন মেসি আমাকে দেখতে আসবে। আর্জেন্টিনার শৈল্পিক খেলোয়াড়রা কাঁধে হাত রেখে বেঁচে থাকার সাহস জোগাবে। তাও অসম্ভবের এস্বপ্ন পূরনের কোন আশা না থাকলেও স্বপ্নবাজ মতিন আশা ছাড়েননি।
মতিন হাত-পা হারিয়ে যখন শয্যাশায়ী তখনও তার প্রেমিকা ফাতেমা তাকে ছেড়ে যায়নি। অনিশ্চিত একটি জীবন জেনেও অভিভাবকদের অমতেই বিয়ে করেন মতিনকে। বিয়ে করে প্রিয় মানুষের সেবার কাজে লেগে যান। মতিন বলেন, তাদের দুই জনের মধ্যে ভালবাসা সম্পর্ক ছিল। দূর্ঘটনার পরে মনে করেছিলাম ফাতেমা হয়তো আর সম্পর্কটা রাখবে না। কিন্তু ঘটলো উল্টো। এখন খাওয়া, কাপড় পরিষ্কার করা, প্রস্রাব-পায়খানা থেকে শুরু করে সব কাজ স্ত্রী করেন।
তাদের সংসার আলো করে জান্নাতুল ঝুমুর নামের ১০ বছর বয়সী একটা কন্যা সন্তানও আছে। সরেজমিনে গেলে ফাতেমা যুগান্তরকে বলেন, মানুষটাকে ভালোবাসি, ভালোবাসার মানুষকে ভালোবেসে সেবা করে যেতে চাই। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিরা আর্জেন্টিনাপ্রেমি মতিনকে দেখতে আসেন। আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রদূতও মতিনকে ঢাকায় নিয়ে সাক্ষাত করে আলাপ করেছেন।