Image description

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) শিশুদের জন্য নির্ধারিত ২০৭, ২০৮ ও ২১০ নম্বর ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডে ভয়াবহ রোগীর চাপ, সিট সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় আনা হলেও হাসপাতালের পরিবেশ ও সেবার মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে।

গত শনিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে ১৪টি বেডের বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৮২ জন শিশু রোগী। ২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২০টি বেড থাকলেও রোগী ৬৪ জন। আর ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১৮টি বেডের বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৪৮ জন। ফলে প্রতিটি ওয়ার্ডেই ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ থেকে শিশু জুনায়েদকে নিয়ে এসেছেন মাসুম পারভেজ। তিনি জানান, প্রায় এক বছর ধরে তার সন্তানের চিকিৎসা চলছে। আট দিন ধরে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি

আছেন তারা। তার অভিযোগ, ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শিশুদের কষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া রাতের বেলায় নার্সদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগও করেন তিনি। তার ভাষ্য, একবার ডাকলে তিনবার ধমক দেওয়া হয়। নিচের আয়া ও কর্মচারীদের আচরণও খারাপ।

একই ওয়ার্ডে নরসিংদী থেকে আসা হাসিনা বেগম তার ৯ মাস বয়সী ছেলে আবির হাসানকে নিয়ে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা ভালো হলেও অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আগে ছেলের অবস্থা খারাপ ছিল, এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে।’

নরসিংদীর আরেক বাসিন্দা লাভলী বেগম জানান, তার সন্তানের কিডনি ও মস্তিষ্কজনিত জটিলতা রয়েছে। দুই মাস ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘বারবার বলার পরও বিকাল পর্যন্ত বাচ্চার ক্যানুলা লাগানো হয়নি। ক্যানুলা না হওয়ায় ওষুধও দেওয়া যাচ্ছে না। নার্সরা শুধু পরে আসতে বলছেন।’

২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি মুরসালীনের সঙ্গে থাকা তার নানি উম্মে কুলসুম বলেন, ‘এখানে থাকতে থাকতে আমিই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের খাবারে গন্ধ, তাই বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। তবে ডাক্তাররা নিয়মিত দেখছেন, চিকিৎসাও ভালো।’

শিশু তানহাকে নিয়ে হাসপাতালে থাকা মোহাম্মদ তাওহীদ বলেন, এক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই। সকাল থেকে ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এক বেডে দুজন রোগী থাকায় গরম আরও বেশি লাগছে। পুরো রুমটা যেন কবরের মতো লাগে।’

তিন বছর বয়সী ক্যানসার আক্রান্ত শিশু রায়ানকে নিয়ে ২৫ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন হোসনেয়ারা আক্তার। তিনি জানান, ক্যানসার ওয়ার্ডে কোনো সিট না পাওয়ায় শিশু ওয়ার্ডেই থাকতে হচ্ছে। সরকারের কাছে তিনি ক্যানসার চিকিৎসার উন্নত ব্যবস্থা ও বেড সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান।

রোগীর স্বজন আল আমিন হোসেন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে পানি ও বিদ্যুতের সংকট প্রায়ই দেখা দেয়। ওয়াশরুমগুলোর বেশিরভাগের ছিটকিনি নষ্ট থাকায় নারী স্বজনদের নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হয়।

তবে রোগীর চাপের কারণে সেবাদানে বিলম্ব হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন হাসপাতালের কর্মীরাও। কোনো কোনো অভিভাবক তা মেনেও নিতে চান। ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘রোগীর চাপ অনেক বেশি। তাই সেবা পেতে দেরি হয়। শুধু নার্সদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।’

কর্তব্যরত এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা খুবই কম। তিনি বলেন, ‘নাইট ডিউটিতে বসার সময়ও থাকে না। ৮০ জন রোগীর ক্যানুলা, ইনজেকশন ও ওষুধ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। পাশাপাশি অসংখ্য খাতা ও রিপোর্টও মেইনটেইন করতে হয়।’ তিনি আরও জানান, রোগীর সঙ্গে অতিরিক্ত স্বজন

থাকায় ওয়ার্ডে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। একজন আনসার সদস্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সমস্যার মূল কারণ রোগীর অতিরিক্ত চাপ। সব হাসপাতালকে রোগী ভাগাভাগি করে নিতে হবে এবং নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। নতুন মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে।’ তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসক ও আড়াই হাজার নার্স রয়েছেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী এ সংখ্যার বিপরীতে আরও অনেক বেশি নার্স ও কর্মচারী প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য নির্ধারিত বেডের তুলনায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বেড না থাকায় এক বেডে একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখাও হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশুদের জন্য বেড সংখ্যা বৃদ্ধি, সংক্রামিত ও অসংক্রামিত রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্যভিত্তিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মত দেন তিনি। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক কার্যক্রম চালুরও পরামর্শ দেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই সমস্যা অনেক পুরনো। পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ৩২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ বিষয়ে পরিকল্পনা করা হবে।’