Image description

ঢাকার সাভারের মহাসড়কে চলাচলকারী অনেকেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ভিডিও নজরদারির আওতায় মামলা ও জরিমানা পরিশোধের ভুয়া মেসেজ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তবে জেলা পুলিশ বলছে, সাভার অঞ্চলে এমন মামলার কোনও প্রচলন শুরু হয়নি। মেসেজগুলো প্রতারণার কৌশল বলে অভিহিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে এআই নজরদারির আওতায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের মুঠোফোনে মামলা ও দণ্ড সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ তথ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে প্রতারক গোষ্ঠী। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এর আদলে নকল ওয়েব সাইট তৈরি করে বিভিন্ন নম্বর থেকে মামলা ও জরিমানার মেসেজ দেওয়া হচ্ছে পরিবহন মালিকদের। এর মধ্যে অন্তত কয়েকজন পরিবহন মালিকের মোবাইলে আসা জরিমানা সংক্রান্ত মেসেজের স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

জরিমানার ম্যাসেজ ও বিআরটিএ’র ভুয়া ওয়েবসাইটের কোলাজ ছবিজরিমানার ম্যাসেজ ও বিআরটিএ’র ভুয়া ওয়েবসাইটের কোলাজ ছবি

অন্তত দু’জন মালিকের ফোনে আসা মেসেজের প্রেরকের নম্বর (+639489958531 ও +639993249285)। দুটি নম্বরের আন্তর্জাতিক কলিং কোড যাচাই করে দেখা যায় (+৬৩) কোডটি ফিলিপাইনের। দুটি মেসেজের বার্তাই ছিল প্রায় একরকম। 

 

মেসেজে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক জরিমানার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিজ্ঞপ্তি। জরিমানা নম্বর: 2026-BD-47821039V। তারিখ: ২৩ মে, ২০২৬। ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থা অনুযায়ী আপনি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেছেন। একটি নির্ধারিত এলাকার মধ্যে আপনার যানবাহনটি অবৈধভাবে চালানোর বিষয়টি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। অনুগ্রহ করে ২৩ মে, ২৪:০০টার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগইন করে জরিমানা পরিশোধ করুন!

বিলম্বিত পরিশোধ: যেহেতু এই লঙ্ঘনটি যাচাই করা হয়েছে, তাই বকেয়া পরিশোধের তথ্য জাতীয় চালক ডেটাবেস এবং আপনার ক্রেডিট রেকর্ডে সিঙ্কোনাইজ করা হবে। আমরা আইন অনুযায়ী বকেয়া জরিমানা পরিশোধ এবং যানবাহন জব্দসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করব। দেখুন এবং পরিশোধ করুন: https://bsbrtcar-bdpay.sbs

"ইলেকট্রনিক এভিডেন্স ইমেজ" এবং "প্রশাসনিক জরিমানা বিজ্ঞপ্তি" দেখার জন্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে "1" লিখে এসএমএসটি পুনরায় খুলুন।”

সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা একটি প্রাইভেটকারের মালিক। তিনি মেসেজ পেয়েছেন শনিবার বিকাল ৩টার দিকে। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে তার গাড়ির নিবন্ধন নম্বর দিলে তাকে দেখানো হচ্ছে শনিবার দিনে সাভারে তার গাড়ি নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। অথচ, সেদিন তার গাড়িটি ছিল ঢাকায়। 

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার গাড়ি সাভারে ছিল না। কিন্তু মামলা হয়েছে সাভারে। আমি ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখে খটকা লাগায় পরে বিআরটিএতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এটা ছিল ভুয়া।

একইরকম মেসেজ পেয়েছেন সাভারের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন খান আনু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি প্রায় ৫ মাস ধরে আমার গাড়ি বের করিনি। হঠাৎ এমন মেসেজ পাই। আমি তো টাকা দেবো করে ঢুকে দেখি এটা সম্পূর্ণ ভুয়া। 

ভুয়া মামলা ও জরিমানার তথ্য পাঠানোর মেসেজের সঙ্গে যে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে, সেটির সঙ্গে বিআরটিএ এর মিল পাওয়া যায়নি। বিআরটিএ এর আসল ওয়েবসাইটের ইউআরএল লিংক ”https://bsp.brta.gov.bd/login”। 

সচেতনতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের, প্রতারণার কৌশল বলছে পুলিশ

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সাকের উজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব নম্বর থেকে মেসেজ দেওয়া হয়েছে, এগুলো ইন্টারন্যাশনাল ডায়াল কোড অনুযায়ী ফিলিপাইনের ডায়াল কোড। বিআরটিএ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, তারা তাদের নম্বর থেকে মেসেজ পাঠিয়ে থাকে। ফলে মেসেজের প্রেরক নম্বর থেকেই স্পষ্ট এটি এক ধরনের প্রতারণা। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের সকল ওয়েবসাইট ডট জিওভি (gov) ডট (bd) দিয়ে নিবন্ধিত। এখানে যে ওয়েবসাইটের তথ্য দেওয়া হয়েছে সেটিও স্পটত একটি নকল ওয়েবসাইট। গ্রাহকদের উচিৎ এই ধরনের প্রতারণা থেকে মুক্তিতে সরাসরি বিআরটিএতে যোগাযোগ করা। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচিৎ এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে রাষ্ট্রের প্রচারণা, সচেতনতা ও একইসাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিআরটিএ তার নিজস্ব নম্বর থেকে মেসেজ দিয়ে থাকে। এ ধরনের নম্বর বিআরটিএর নয়। এআই মামলা ঢাকা মহানগরে শুরু হয়েছে। সাভার বা ঢাকা জেলায় এ ধরনের মামলার কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে এ ধরনের মামলার কোনও ঘটনা নেই। এই মেসেজ প্রতারণার কৌশল হতে পারে। সাধারণ মানুষ যাতে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে না পড়েন। আর লেনদেন করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে। একটা বিষয় এআই দিয়ে কোনও মামলা এই অঞ্চলে শুরু হয়নি। ফলে এ ধরনের মেসেজেরও কোনো সুযোগ নেই।