Image description

ক্ষমতার পালাবদলে যেমন বদলে যায় দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তেমনি সংস্কৃতি পড়ে যায় রাজনীতির ঘেরাটোপে। বদলে যায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধরন-ধারণ। বদল আসে এই খাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নেওয়া তেমনই এক প্রকল্প পড়েছে ‘ক্ষমতার পালাবদলের খপ্পরে’।

দুই বছরের বেশি সময় আগে (আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে) রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি লেকে ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে এখন দেখা দিয়েছে চরম সংশয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির নাম বদলে ফেলে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকার প্রস্তাবিত ‘নজরুল সরোবর’ নাম বদলে রাখে ‘বিদ্রোহী চত্বর’। কিন্তু সেই নাম বদলই সার। এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়ে এসেছে নির্বাচিত সরকার। তবে এর মধ্যে প্রকল্পটির আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে এসে পুরো প্রকল্পটি পড়েছে রিভিউ বা পর্যালোচনার মুখে। ফলে প্রকল্পটির আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না— উঠেছে সেই প্রশ্নও।

অবশ্য নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলীর দাবি, তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ‘বিদ্রোহী চত্বরের’ কাজটি সাময়িকভাবে থেমে গিয়েছিল।

অবশ্য  নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে নতুন করে একটি প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করলেন, ‘আমরা আশা করছি এটি আবার চালু হবে।’

১৯৯৬ সালে যখন ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রথম ধানমন্ডি লেকের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নকাজ শুরু করে, তখন এর মূল মাস্টারপ্ল্যান ও নকশা করেছিল স্থপতি ইকবাল হাবিবের নেতৃত্বাধীন একটি দল। আগামীর সময়কে তিনি শোনালেন সেই শুরুর গল্প, ‘আমরা যখন ধানমন্ডি লেকের নান্দনিক সৌন্দর্যবর্ধনের নকশা করেছিলাম, তখন রবীন্দ্র সরোবর বা নজরুল সরোবর নামে সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না। তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উন্মুক্ত মঞ্চ রাখা হয়েছিল, যা পরে রবীন্দ্র সরোবর হিসেবে পরিচিতি পায়। শুনেছিলাম আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ধানমন্ডি লেকের কিছু জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করে সেখানে নজরুল সরোবর করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। পরে আবার শুনলাম অন্তর্বর্তী সরকার সেটিকে ‘বিদ্রোহী চত্বর’ বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ধানমন্ডি লেকে ‘রবীন্দ্র সরোবর’-এর আদলে একটি ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের ঘোষণা দেয়। চূড়ান্ত হয়েছে তার নকশাও।

তার আগে লেকের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএসসিসি। অবৈধ অংশ ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছিল ৬০ কাঠা ভূমি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পান লতিফুল ইসলাম শিবলী। ওই বছরের ১০ নভেম্বর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে আসেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

ওই বছরের ২৭ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর উপস্থিতিতে এক যৌথ সভায় নজরুল সরোবর প্রকল্পটির নাম বদলে ‘বিদ্রোহী চত্বর’ করার সিদ্ধান্ত হয়। লতিফুল ইসলাম শিবলী জানিয়েছিলেন, প্রায় ৬০ কাঠা জায়গার ওপর এই বিদ্রোহী চত্বরের নকশাও চূড়ান্ত করা হয়।

সে সময় উচ্ছ্বসিত হয়ে লতিফুল ইসলাম ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘তিন মন্ত্রণালয়ের তিন উপদেষ্টাকে এক মিটিংয়ে বসানোর মতো কঠিন কাজটা করে ফেলেছে নজরুল ইনস্টিটিউট। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট আর তিন মন্ত্রণালয়ের তিন উপদেষ্টা মিলে আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো— খুব তাড়াতাড়ি আমরা কবি নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দ্রোহের চেতনাকে এক করে নির্মাণ করতে যাচ্ছি ‘বিদ্রোহী চত্বর’ Rebel Square। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার রোড নম্বর ১৩/এ এবং ৮/এ সংলগ্ন লেকপাড়ের এই বিদ্রোহী চত্বর এ দেশের তারুণ্যকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে– ব্রিটিশ থেকে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ, কেউ আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।’ কিন্তু সেই প্রকল্পটি থমকে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়ই দমে কি না, উঠেছে সে প্রশ্নও।