২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গঠন করা হয়েছিল জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। অন্তর্বর্তী আমলে গঠন করা এই ফাউন্ডেশন ধারাবাহিকভাবে শহীদ ও আহতদের সহায়তা করে আসছিল। কিন্তু বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে ফাউন্ডেশনটি। বরাদ্দের অভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। ৮ মাস ধরে বকেয়া রয়েছে ফাউন্ডেশনটির ভাড়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও সুফল পাননি ফাউন্ডেশনটির কর্তারা। এতে হতাশা বাড়ছে ফাউন্ডেশনটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যত নিয়েও। এদিকে, ফাউন্ডেশনের একটি সূত্র জানায়, অর্থ সংকটসহ হতাশায় গত ১৯শে মে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ফাউন্ডেশনের কর্মচারী সুনীল রবিদাস। ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবজমিনকে বলেন, ফাউন্ডেশনের শুরু থেকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পদোন্নতি কিংবা বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এ ছাড়া সরকার কর্তৃক ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করায় এবং ফাউন্ডেশনের জন্য নতুন করে কোনো বরাদ্দ না আসায় এর কার্যক্রম চলবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের পিআর অ্যান্ড মিডিয়া এক্সিকিউটিভ মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, বর্তমানে ফাউন্ডেশনটিতে ৩৫ জন কর্মকর্তা, ২ জন কর্মচারী এবং ৫ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি মাসে তাদের বেতন বাবদ প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনটির প্রতিমাসে ভাড়া বাবদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তিনি বলেন, জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সোনালি ব্যাংকের রমনা ব্রাঞ্চে দু’টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। একটি মাদার অ্যাকাউন্ট। এই অ্যাকাউন্টে বর্তমানে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, মাদার অ্যাকাউন্টের টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করতে পারবে না। অপরটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য অপারেশন অ্যাকাউন্ট। বর্তমানে এই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। এখন ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন করে বরাদ্দ না দিলে, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা প্রদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফাউন্ডেশনটি কতোজনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩ ধাপে প্রকাশিত গেজেটে শহীদদের সংখ্যা ছিল-৮৩৪, ১০ ও ১২ জন। বিভিন্ন কারণে গেজেট বাতিলের সংখ্যা ১৩ জন। সে হিসাবে মোট গেজেটভুক্ত শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। এদের মধ্যে বেশির ভাগকেই অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত আহতের সংখ্যা ১৫৪৯১ জন। এদের মধ্যে ৬১২৭ জন আর্থিক সহায়তা পেলেও ৯৩৬৪ জন ফাউন্ডেশন থেকে কোনো সহায়তা পায়নি।
এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের সহায়তার জন্য প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু ১১৯ কোটি ৪২ টাকার তহবিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অপারেশনাল কাজের জন্য ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও এই টাকা থেকে আহত শহীদ পরিবারকেও বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাবে সবাইকে সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অপারেশন অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় পরের মাসগুলোর ব্যয় কীভাবে হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
ফাউন্ডেশন কেমন সেবা দিচ্ছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতদের জরুরি আর্থিক সহায়তা, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের বরাদ্দের অভাবে চলতি মাসে আমার ব্যক্তিগত পেনশনের টাকা থেকে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে কর্মকর্ত-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। আমরা কয়েক দফা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর ইশরাক হোসেনের সঙ্গে দেখা করে এর সমাধানের চেষ্টা করেছি। মন্ত্রী মহোদয় ঈদের পরে আমাদের সঙ্গে বসবেন বলে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। কর্মচারী সুনীল রবিদাসের আত্মহত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, সে হয়তো পারিবারিক অসন্তোষ থেকে আত্মহত্যা করতে পারে।