Image description

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসূচির বিভিন্ন শর্ত সাংঘর্ষিক। ফলে নতুন একটি তিন থেকে চার বছর মেয়াদি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সরকার। নতুন এ কর্মসূচির আওতায় সংস্থাটি থেকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পেতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষের সম্মতিতেই চলমান কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুনভাবে ঋণ কর্মসূচি শুরু করার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকার বর্তমান কর্মসূচিতে আর থাকতে চায় না। একই সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামো, সময়সীমা ও অর্থের পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আইএমএফও এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বাংলাদেশ আইএমএফকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে।  
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে আগামী জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকা সফর করবে। তখন ঋণের পরিমাণ, সময়সীমা এবং শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া বিদ্যমান আইএমএফ কর্মসূচি থেকে সরে আসার পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে মতপার্থক্যকে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের স্প্রিং মিটিংয়ের ফাঁকে হওয়া বৈঠকে আইএমএফ জানিয়ে দেয়, সংস্কার কার্যক্রমে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে আর কোনো কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে না।

বাংলাদেশ চলতি বছরের জুনের মধ্যে বিদ্যমান কর্মসূচির পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তি মিলিয়ে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা ছিল। তবে সংস্কার অগ্রগতিতে অসন্তোষ থাকায় সেই অর্থ ছাড় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
গত ১৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন সফর শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া এই কর্মসূচিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা নির্বাচিত সরকার। জনস্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত আমরা মেনে নেব না।

সরকার ও আইএমএফের মধ্যে মতবিরোধের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি হ্রাস, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার আপাতত এসব কঠোর সংস্কারে যেতে আগ্রহী নয়।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি সক্রিয় আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ‘সিল অব অ্যাপ্রুভাল’ হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে আগামী কয়েক বছরে প্রতিবছর তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা প্রয়োজন হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফ থেকে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেলে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া সহজ হবে।

আলোচনার অগ্রগতি দেখে সরকার আশাবাদী যে, আইএমএফ বাংলাদেশকে একটি ‘কমফোর্ট লেটার’ দেবে। এটি এমন একটি লিখিত নিশ্চয়তা, যা বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার উপযোগী দেশ হিসেবে তুলে ধরে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) সাধারণত বড় অঙ্কের বাজেট সহায়তা দেওয়ার আগে এমন নিশ্চয়তা চায়।

বাংলাদেশ আশা করছে, জুনের মধ্যে এসব সংস্থা থেকে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়া যাবে।

চলমান কর্মসূচিতে যা ছিল
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে এর আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি রয়েছে আরও ১৮৬ কোটি ডলার।

তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় আইএমএফ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গত মার্চে ঢাকা সফরে এসে সরকারের কাছে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট করেন।
গত মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল অতিরিক্ত ঋণ এবং চলমান কর্মসূচির কিস্তি ছাড় নিয়ে আলোচনা করে। এরপর আরও কয়েক দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

কঠিন শর্ত নিয়ে আপত্তি
আইএমএফ বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি কঠোর শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল। এই ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছে আইএমএফ।

এ ছাড়া আইএমএফের অন্যতম শর্ত ছিল প্রতিবছর জিডিপির অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য পূরণে এনবিআর ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি এবং নতুন সরকার পরে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়।
তবে আইএমএফ চাইছে, আগামী মাসের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা হোক।

অর্থ বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাত সংস্কারে নতুন সরকারের অবস্থান নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধনের পর তারা একে আর্থিক খাত সংস্কারে পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

শুধু ব্যাংক খাত নয়, রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়েও চাপ বাড়ছে। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, টার্নওভার কর চালু এবং করপোরেট কর পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি চাচ্ছে দাতারা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি সীমিত করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, সর্বজনীন ভর্তুকি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। এর পরিবর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালুর সুপারিশ করা হয়। 

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, ঋণ কর্মসূচির আওতায় যেসব সংস্কারমূলক শর্তের বিষয় রয়েছে, সেগুলো দেশের অর্থনীতির জন্যই করা প্রয়োজন। তাছাড়া এসব শর্ত বাস্তবায়নে অনেক অগ্রগতিও হয়েছিল। তাই সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখলে দ্রুত অর্থ পাওয়া যেত। যা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বাড়তি জ্বালানি তেলের দামের কারণে বৈদেশিক মুদ্রায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা ম্যানেজমেন্ট করা সহজ হতো।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, নতুন কর্মসূচিতে ডলারের পরিমাণ হয়তো বাড়বে, তবে আইএমএফের প্রক্রিয়া শেষ করে এ অর্থ পেতে অনেক দেরি হবে। তাছাড়া বাড়তি অর্থের কারণে যদি আরও বেশি শর্ত আরোপ হয় এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করা না যায় তাহলে অর্থ পাওয়া যাবে না। তখন এ কূল ওই কূল– দুই কূলই হারাবে।