Image description

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চলছে। সোমবার অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত কমিটির এক বৈঠকে সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের আগামী বাজেট অধিবেশনের আগে এই মন্ত্রিসভার একটি কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলে জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলে আসছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। তারা সরকারকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে। আমাদের দেশে যদি বিরোধী দল সেটা করে, তাহলে রাজনীতির জন্য ভালো কিছু হতে পারে।

সম্প্রতি জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জাপান সফরে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সভায় ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। দেশে আসার পর আবারও বিষয়টির দিকে নজর দিয়েছেন তিনি। সোমবার এ সংক্রান্ত এক সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও কে কোন মন্ত্রণালয়ে নজর রাখবেন বা দেখবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছায়া মন্ত্রিসভার একটি তালিকা দেখা গেলেও এর সত্যতা কেউ স্বীকার করেননি। তবে দলীয় সংসদ-সদস্যদের প্রায় সবাই এতে যুক্ত হবেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী নেতারাও এতে যুক্ত হবেন। সূত্র বলছে, দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আব্দুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও কর্মপরিষদের অনেক সদস্য এ ধরনের দায়িত্বে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া জুলাই যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রশিবিরের অন্তত ২ জন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের নেতাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন এতে। পাশাপাশি যুক্ত হতে পারেন একাধিক অমুসলিম প্রতিনিধি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে জানান, আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা করব, এটা আগেই বলে এসেছি। এখন এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সোমবার এ সংক্রান্ত বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমিরে জামায়াত এ ব্যাপারে অত্যন্ত সিরিয়াস।

দলের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু কনসেপ্টটা নতুন, তাই আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এটি বিশ্লেষণ করছি। তাড়াহুড়া করছি না। ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কী হবে-এমন প্রশ্নে জুবায়ের বলেন, মূলত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট ছায়ামন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। তারা সরকারের কার্যক্রম মনিটর করবেন এবং অসংগতিগুলো ধরিয়ে দেবেন। প্রয়োজনে বিবৃতি দেবেন বা অন্যভাবে সরকারের দৃষ্টিতে আনবেন। এর মাধ্যমে সরকারকেই সহযোগিতা করা হবে। সরকার ছায়ামন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করলে দেশ লাভবান হবে।

জুবায়ের আরও বলেন, সরকারকে সহযোগিতার পাশাপাশি ছায়া মন্ত্রিসভা দলের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ছায়ামন্ত্রী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন। ফলে তার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, জানার পরিধিও বাড়বে। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ওইসব মন্ত্রণালয় পরিচালনা সহজ হবে।

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা পুরোনো হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন আলোচনা নতুন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভার’ ধারণাটি এসেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইনসভায় সরকারি দলের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যদের শুধু বিতর্ক করাই যথেষ্ট নয়, সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের কিছুটা বাড়তি দায়িত্বও পালন করতে হয়। তাই সরকারের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিরোধী দলের সদস্যরা যখন একটি আনুষ্ঠানিক সমান্তরাল কাঠামো গড়ে তোলেন, তখন সেই কাঠামোকে বলা হয় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’। বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেখানকার ভুলত্রুটি জনগণের সামনে তুলে ধরবেন।

সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত একটি সমান্তরাল মন্ত্রিসভাকে ছায়া মন্ত্রিসভা হিসাবে অভিহিত করা হয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ থাকেন। এই ‘মন্ত্রীরা মূলত বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা। যেমন: অর্থমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা ক্ষমতায় না থাকলেও সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি, বাজেট, আইন ও কর্মসূচি নিয়ে বিকল্প ভাবনা তুলে ধরেন। ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বিরোধীদের একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প শাসন-প্রস্তুতির কাঠামো। শুধু বিরোধিতা নয়, একই ইস্যুতে নিজেদের নীতিগত সমাধান তুলে ধরে ছায়া মন্ত্রিসভা। বাজেট, আইন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, সব বড় আলোচনায় ছায়া মন্ত্রীরা খাতভিত্তিক বক্তব্য দেন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে জয়ী হলে এ ছায়া মন্ত্রীরাই প্রায়ই মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ফলে তাদের প্রশাসনিক প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকে। এতে বিরোধী দলে থাকা অবস্থাতেই রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসনিক দক্ষতা তৈরি হয়।

ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত গ্রেট ব্রিটেনের ‘ওয়েস্টমিনস্টার’ ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকারী দেশগুলোয় বেশি প্রচলিত। এর সবচেয়ে কার্যকর, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী রূপ দেখা যায় যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় ‘হিজ ম্যাজেস্টিস মোস্ট লয়্যাল অপজিশন’, অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত কিন্তু সরকারের বিরোধী। অস্ট্রেলিয়ায়ও বিরোধী দল সুসংগঠিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে এবং সংসদীয় কমিটি ও নীতিনির্ধারণী বিতর্কে সক্রিয় থাকে। কানাডায় ছায়া মন্ত্রিসভাকে কখনো ‘অপজিশন ক্রিটিক’ বলা হয়। সেখানে প্রতিটি খাতের জন্য সমালোচক নির্ধারিত থাকে। নিউজিল্যান্ডেও বিরোধী দল সরকারবিরোধী নীতি বিশ্লেষণ ও বিকল্প পরিকল্পনায় ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে।

ব্রিটেনের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা করলেও ভারতে আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা নেই। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল অনানুষ্ঠানিকভাবে খাতভিত্তিক মুখপাত্র ও সমন্বয়ক রাখে, যা আংশিক ছায়া মন্ত্রিসভার কাঠামোর মতো কাজ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকা, মালয়েশিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ আরও কয়েকটি ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বিভিন্ন মাত্রায় ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা আছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য জোরদার হয়, নীতিনির্ধারণে বিকল্প চিন্তার প্রসার ঘটে, ক্ষমতার পালাবদলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং একদলীয় আধিপত্যের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।