জন্মের পরপরই দৃষ্টিশক্তি হারান মনিরুল ইসলাম। একমাত্র ছেলের দৃষ্টি হারানোর শোকে মারা যান বাবা। এরপর শুরু হয় মনিরুলের জীবনসংগ্রাম। তবে পাশে ছিলেন মা। যার হাত ধরে স্কুল, কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন তিনি। এরপরই বাধে বিপত্তি, পড়ালেখার খরচ চালাবেন কীভাবে! বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েই শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। সহপাঠীর সঙ্গে শুরু করা ওই ব্যবসায় নানা চড়াই-উতরাই এসেছে, কিন্তু দমেননি মনিরুল। সেই ব্যবসার আয় দিয়েই চালিয়েছেন পড়ার খরচ। শেষ করেছেন স্নাতকোত্তরও। এখন চালান মা আর বোনের খরচও।
মনিরুল বলছিলেন, ‘অন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা আসে। সেগুলো পেরিয়ে ভালোই আছি। কোনোদিন ১৭ হাজার টাকার পণ্য যেমন বিক্রি করি, আবার কোনোদিন হয় ৩০০ টাকায়। ক্রেতাদের বেশিরভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ভালোই সাড়া পাই।’
একই পথের পথিক বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক শিক্ষার্থী শাহজাহান গাজী। জন্মের পরপরই বাবা-মাকে হারান। আশ্রয় হয় নানার কোল। হঠাৎ একদিন থাবা দেয় টাইফয়েড জ্বর, যা কেড়ে নেয় তার চোখের আলো। যে নানার হাত ধরে বড় হচ্ছিলেন, তিনিও মারা যান ২০১৭ সালে। এমন পরিস্থিতিতেও শাহজাহান চালিয়ে গেছেন লেখাপড়া। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে পড়ার।
সেই সময়ের কথা মনে করে শাহজাহান গাজী বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর বড় চিন্তা শুরু হলো, কীভাবে এ খরচ চালাব। তখন থেকেই শুরু করলাম ব্যবসা। শিক্ষার্থীরাও ভালোই সাড়া দিচ্ছেন। সবকিছু বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়।’
শুধু মনিরুল কিংবা শাহজাহান নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও চার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর শিক্ষার্থীর খোঁজ পেয়েছে আগামীর সময়, যারা পড়ালেখার খরচ জোগাচ্ছেন ব্যবসা করে। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি টানছেন পরিবারের খরচের ভারও। তাদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান। জন্মান্ধ এ শিক্ষার্থী ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন। তবে লেখাপড়া শেষ হলেও পাননি চাকরি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে মল চত্বর থেকে হলপাড়াগামী মূল রাস্তার পাশেই একটি ছোট্ট টেবিল আর একটি টুল নিয়ে শুরু করেছেন ব্যবসা। সন্ধ্যা থেকে প্রতিদিন থাকেন রাত ১১টা পর্যন্ত। বিক্রি করেন ব্রাশ, নেইলকাটার, কটন বাডসহ নানা দৈনন্দিন পণ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল গেটের পাশে একটি ছোট্ট টেবিলে প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী নিয়ে বসেন মীর আজিজুল হক আপন। পড়ালেখা শেষ করেছেন বছর তিনেক আগে। ২০২২ সালে হওয়া প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। অভিযোগ করলেন, পোষ্য কোটার অজুহাতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও পাননি চাকরি। এখন এই ছোট্ট ব্যবসাই তার আয়ের একমাত্র উৎস। আজিজুল বললেন, ‘তার ক্রেতা বেশিরভাগই ঢাবির শিক্ষার্থী। যে যার মতো দাম করে টাকা দিয়ে পণ্য নিয়ে যান। চোখে দেখতে পাই না বলে কোনো সমস্যা হয় না।’ একইভাবে ছোট ব্যবসা করে পড়ার খরচ চালাচ্ছেন বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুমন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের রাসেল হাওলাদারও। তাদের সবারই মত, কিছু না করার চেয়ে কিছু করা ভালো। আর সেই ভাবনা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়েও পথের ধারে টেবিল নিয়ে বসতে পিছপা হননি তারা। পড়ার খরচ তো চালিয়েছেনই, নিয়েছেন সংসার চালানোর ভারও। এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ভবিষ্যতে ব্যবসা বড় করা। যেন নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। চোখে দেখতে পান না, এই অজুহাতে আর কাউকে যেন চাকরির দরজা থেকে ফিরে যেতে না হয়, তেমন পরিবেশ সৃষ্টি করা।