Image description

কুড়িগ্রামের বাসিন্দা ইসতিয়াক মিলন চাকরির খোঁজে ঢাকায় এসেছিলেন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে বেসরকারি একটি অফিসে চাকরিও শুরু করেন। তবে ৮ মাসের মাথায় জীবনে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর অফিসে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর স্থানীয় বাবলি মসজিদের সামনে ‘পাকা রাস্তার ওপর’ নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ দেওয়ার অভিযোগ এনে শিল্পাঞ্চল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় ইসতিয়াককে। তিনি ওই মামলার সন্দেহভাজন আসামি। তবে তার কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই।

প্রায় দুই মাস কারাভোগের পর ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর মামলাটিতে জামিন হয় ইসতিয়াকের। চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসা এই যুবকের জেলজীবনের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত; কিন্তু একই থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে (শ্যোন অ্যারেস্ট) কারাগারে আটকে রাখে। এর প্রায় তিন মাস পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ দ্বিতীয় মামলায় জামিন পান, এর দুদিন পর কারামুক্ত হন তিনি। তবে ইসতিয়াকের ভাষ্যে বেরিয়ে আসে, নতুন করে শ্যোন অ্যারেস্টের ‘খপ্পরে পড়া’ ঠেকাতে তার নানা ঘাট ‘ম্যানেজ’ করতে হয়েছে।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ভাইয়ের বাসায় থেকে টিউশনি করে জীবনধারণ করতেন আল মারুফ নামে এক তরুণ। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাইয়ের বাসা থেকেই র‌্যাব তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর রাতে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্পে অবস্থিত যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে দায়ের মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে মারুফকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। যদিও পুলিশ প্রতিবেদনে তাকে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা সাবান ফ্যাক্টরির রোড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করার কথা বলা হয়। এরপর এ তরুণের বিরুদ্ধে রমনা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। দুই মামলায় জামিন মিললেও রমনা থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের আরও দুই মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। ‘ম্যানেজে’ ইসতিয়াকের কারামুক্তি মিললেও শ্যোন অ্যারেস্টের ‘জাঁতাকলে’ পড়ে এক বছর ৩ মাস ধরে কারাবন্দি মারুফ।

শ্যোন অ্যারেস্টের জাঁতাকলে পড়ে কারাবাসের এমন গল্প শুধু ইসতিয়াক কিংবা মারুফের নয়; কোনো একটি মামলায় আদালত থেকে জামিন হওয়ার পর ফের নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর (শ্যোন অ্যারেস্ট) ঘটনায় শত শত বন্দির কারাবাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। নানা স্তরের ‘ছাড়পত্র’ আর পুলিশি ক্লিয়ারেন্সের ‘নেগেটিভ’ প্রতিবেদনে নতুন মামলার আসামি হতে হচ্ছে জামিন পাওয়া আসামিদের। এই ছাড়পত্র ঘিরে পুলিশি বাণিজ্যেরও অভিযোগ উঠেছে। শ্যোন অ্যারেস্টের পর নানা ঘাট পেরিয়ে সম্প্রতি জামিন পাওয়া অন্তত ৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হলে তারা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, জামিন হলেও জামিননামা কারাগারে না গিয়ে আগে তা পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগে যায়। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা ঠিকানা ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবার কোনো পরিবার আগেই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এভাবে ‘ম্যানেজ’ করে শ্যোন অ্যারেস্ট এড়াতে হয়।

পাশাপাশি শ্যোন অ্যারেস্ট হয়ে আদালতে হাজিরা দিতে আসা অন্তত দুই আসামির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামিন হলে কারাফটকে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের ছাড়পত্র না মিললে মুক্তিতে জেলখানার কপাট আর খোলে না। কোন আসামির জামিন হয়েছে, তা কারাগারের দায়িত্বরত লোকজনই কারা গেটের গোয়েন্দাদের জানিয়ে দেন। জামিন হলেও কারাগারের ভেতরে শ্যোন অ্যারেস্ট আতঙ্কে থাকেন বন্দিরা। অনেক বন্দি সেই আতঙ্কে জামিনও চান না। তারা সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। তবে জামিন পাওয়া ও কারাবন্দি ওই লোকদের কেউই গণমাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

আদালত থেকে জামিন মিললে সংশ্লিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে কোনো থানায় অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি-না, বা অন্য মামলার আসামি কি-না সেই বিষয়টি সাধারণত যাচাই করার কথা। তবে অন্তত ৩০টি শ্যোন অ্যারেস্টের আসামির মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব আসামি যেসব মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট হয়েছেন, সেই মামলাগুলোর এজাহারে কোনোটিতেই তাদের নাম ছিল না। সবাইকেই সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ফের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

যুগ যুগ ধরে এই শ্যোন অ্যারেস্টের ‘খেলা’ চললেও ২০২৫ সালের আগে আইনের পরিভাষায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ নামে সরাসরি কোনো শব্দ ছিল না। অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডন্যান্স-২০২৫’ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশের ‘১৬৭ এ’ ধারায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। এর তিনটি উপধারায় শ্যোন অ্যারেস্ট আসামির ক্ষেত্রে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার কথা উল্লেখ ছিল। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই অধ্যাদেশ রহিত করে ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ (২০২৬ সনের ১১ নম্বর আইন) তৈরি করে। তাতে শ্যোন অ্যারেস্টের বিষয়ে ‘১৬৭ এ’ ধারার সন্নিবেশ রয়েছে।

এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আমলযোগ্য আদালতে বিচার বা অনুসন্ধানের সময় যদি সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান হয় যে, আদালতে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি একটি অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তবে আদালত সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তিকে আটক করার বা গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষমতা রাখেন, যা শ্যোন অ্যারেস্ট নামে পরিচিত। কিন্তু পুলিশ সাধারণত জামিন হলেই সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে এই শ্যোন অ্যারেস্টের আবেদন করছে।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের শ্যোন অ্যারেস্ট নিঃসন্দেহে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার। এটার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ জড়িত থাকে। একজন মানুষ দোষীসাব্যস্ত হওয়ার আগে পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশেই তাকে কারাবন্দি করে রাখা হয় না। আমাদের দেশে জামিন মিললেও শ্যোন অ্যারেস্টের নামে বন্দি করে রাখা হচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জামিনপ্রাপ্ত আসামির বিরুদ্ধে অন্য মামলা রয়েছে বা অন্য মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, সেক্ষেত্রে শ্যোন অ্যারেস্ট করা যায় কি না—এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, বিষয়টি তো সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আগেই জানার কথা এবং সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কারও জামিন হওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার এই হুঁশ হওয়াটা তো সন্দেহজনক। এজাহারে কারও বিরুদ্ধে নাম থাক বা না থাক বা সন্দেহজনক আসামিকে শ্যোন অ্যারেস্টের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এভাবে কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো উচিত নয়।

আদালত ও পুলিশ সূত্র বলছে, মূলত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে হত্যা, হত্যাপ্রচেষ্টাসহ এ ধরনের মামলাগুলোর আসামিদের শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হচ্ছে। বিশেষ করে ওইসব মামলার এজাহারে আগে কোনো আসামির নাম থাকলেই অন্য থানার মামলাগুলোতে শ্যোন অ্যারেস্টের তালিকায় তাদের নাম ওঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো পর্যায়ে নেতার তালিকায় নাম থাকলেই শ্যোন অ্যারেস্টের তালিকায় নাম উঠে যাচ্ছে।

সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে বা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে—এমন গৎবাঁধা কথা বলে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাতে আবেদন করা উচিত নয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত হলে তো এজাহারেই আসামির নাম থাকত। তা না হলে অন্য কোনো আসামির বা সাক্ষীর ১৬৪ ধারা বা ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে নাম আসলে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো যেতে পারে।

সাবেক এ জেলা জজ আরও বলেন, কোনো মামলায় জামিন লাভের পরে নতুন কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাতে হলে ওই নতুন মামলার কোনো সাক্ষীর বা আসামির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ বা ১৬১ ধারার স্টেটমেন্টে জড়িত না হলে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো আইনের অপব্যবহার। এটা করে কারও কারও অন্যায় লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

যেভাবে শ্যোন অ্যারেস্টের ফাঁদ: আইনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী আদালত জামিন মঞ্জুর করার পর তা কার্যকর করা প্রশাসনের দায়িত্ব। জামিন পাওয়া আসামিকে অযথা কারাগারে আটকে রাখা বা কারামুক্তিতে বিলম্ব আইনের পরিপন্থি। এতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অবশ্য শ্যোন অ্যারেস্ট হওয়া বিভিন্ন আসামির আইনজীবী, স্বজন ও আদালত সূত্র বলছে, আদালত থেকে জামিন হলেই কোনো আসামির সহসা মুক্তি মিলছে না। এজন্য ‘ক্লিয়ারেন্স’ বা ‘ছাড়পত্র’ নেওয়া যেন বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। এই ছাড়পত্র পেলেও এর প্রক্রিয়া করতে গিয়ে জামিনের পরও আসামিকে এক থেকে ৩ দিন পর্যন্ত কারাগারে বন্দি থাকতে হচ্ছে। না পেলে শ্যোন অ্যারেস্টে ফের কারাবাস করতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ছাড়পত্র পেতে নানা ধাপ পার হতে হচ্ছে। জামিন আদেশ জারির পর আসামির মুক্তি পেতে ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্রের জন্য প্রথমে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ, গোয়েন্দা বিভাগ, সংশ্লিষ্ট থানা হয়ে তা কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেও চলে যাচাই প্রক্রিয়া। এই ফাঁকেই চলে ‘ম্যানেজ’ করার নানা প্রক্রিয়া। অদৃশ্য এই ক্লিয়ারেন্স ঘিরে পুলিশের কেউ কেউ রাজনৈতিক মামলার আসামিদের কাছ থেকে নানা সুযোগ নিচ্ছেন। তা সম্ভব না হলে আবেদন করা হচ্ছে শ্যোন অ্যারেস্টের।

রাজনৈতিক মামলায় আসামিদের পক্ষে লড়ছেন—ঢাকার এমন কয়েক আইনজীবী কালবেলাকে বলেন, যে সংখ্যক শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর ভয় দেখিয়ে রফা করা হচ্ছে। আদালত জামিন দিলেও কার্যত পুলিশকে ম্যানেজ করা ছাড়া কারাগার থেকে মুক্তি মেলে না।

শ্যোন অ্যারেস্টের পর জামিন পাওয়া ইসতিয়াক মিলন কালবেলাকে বলেন, প্রথম মামলাটিতেও তার নামই ছিল না। তিনি জামিন পেলে ওইদিনই তার আইনজীবী কোর্টে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগে জামিননামা দাখিল করেন। তবে পরদিনই একই থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ফের তাকে গ্রেপ্তারের আবেদন করে ডিবি! দ্বিতীয় মামলায় জামিন মিললেও জামিননামা দাখিলের পরও দুদিন তাকে কারাগারে ‘অবজারভেশনে’ রাখা হয়। পরে তার পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে নতুন করে শ্যোন অ্যারেস্ট ঠেকাতে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের জিআর শাখাকে ‘ম্যানেজ’ করে।

এই যুবকের ভাষ্য, দ্বিতীয় মামলায় জামিন পেলেও প্রথম ঘটনার মতো শ্যোন অ্যারেস্ট হওয়ার ভয়ে ছিলেন তিনি। জামিনের পর কারাগারে ‘অবজারভেশনের’ অজুহাতে আটকে রেখে নতুন মামলায় আটক দেখানোর নামে টাকা নেওয়া হয়। রাজনৈতিক মামলার সব আসামি কারাগারে শ্যোন অ্যারেস্টের আতঙ্কে থাকেন।

ইসতিয়াকের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি কালবেলাকে বলেন, শুধু ইসতিয়াক নন, তার মতো হাজার হাজার আসামি এক মামলায় জামিন পেলে, আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। থানা-পুলিশকে ম্যানেজ করতে হচ্ছে শ্যোন অ্যারেস্ট যেন না দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এই শ্যোন অ্যারেস্ট শুধু আইনের অপব্যবহার নয় বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একাধিক মামলায় শ্যোন অ্যারেস্টে কারাবন্দি থাকা মারুফের বড় ভাই মো. মহসিন কালবেলাকে বলেন, তার ছোট ভাইটা তার বাসায় থেকে পড়ালেখা করেছে। চাকরি খুঁজছিল, না পেয়ে টিউশনি করত। তাকেই একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। যেসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, এসব জায়গাতেও তার ভাই যায়নি কোনোদিন। টাকা না থাকায় তার ভাইকে কারাগার থেকে বেরও করতে পারছেন না।

মারুফের আইনজীবী ওবাইদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, মারুফকে এক এক করে পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়েছে। তার রাজনৈতিক কোনো পদ-পদবি নেই। এর পরও একটিতে জামিন মিলতেই আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে জেল খাটছে ওই তরুণ। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এ আইনজীবী আরও বলেন, আসামিরা জামিন পাওয়ার পর কোর্ট প্রসিকিউশন বিভাগ থেকে মামলাসংশ্লিষ্ট থানা ও জোনে আসামির নাম, পরিচয় দিয়ে তথ্য পাঠানো হয়। এর পরই নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। রাজনৈতিক পদ-পদবি থাকলে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে পদ-পদবি থাকলেও অনেক সময় পুলিশকে ম্যানেজ করে অনেকে মুক্ত হতে পারছেন। অথচ আসামি জামিন পেলে আইন অনুযায়ী বেলবন্ড জমা দেওয়ার পর তা কারাগারে গেলে মুক্তি পাওয়ার কথা।

যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান কালবেলাকে বলেন, ‘কারাগারে থাকা কোনো আসামি যদি অন্য মামলায় সম্পৃক্ত থাকে, তখন সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে শ্যোন অ্যারেস্টের আবেদন করা হয়। ওই থানা ও সংশ্লিষ্ট ডিভিশন বিষয়টা দেখে। আমাদের কাছে (প্রসিকিউশন বিভাগ) আবেদন আসে, সেটা আমরা আদালতে উপস্থাপন করি।’

সাধারণত তিন ক্যাটাগরির মামলায় জামিনের পর প্রসিকিউশন বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় তথ্য পাঠানো হয় জানিয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলা ও ছিনতাই মামলার আসামিরা জামিন পেলে সেটা সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়।’

শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর জন্য প্রসিকিউশন বিভাগের জিআর শাখা থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ আসলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

আইনজীবী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর রাতে রাজধানীর ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আব্দুল হাকিম নামে নীলফামারীর এক বাসিন্দাকে। তেজগাঁও থানার ওই মামলার তদন্ত চলা অবস্থাতেই তাকে ফের রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ পৃথক আরও দুটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায়। তবে সবকটি মামলায় জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি ওই ব্যক্তির। এবার তাকে নিজ জেলা নীলফামারীতে আরও দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ওই জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুল হাকিম নীলফামারী সদর উপজেলার কচুকাটা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তবে তার এক স্বজন দাবি করেন, হাকিমের বিরুদ্ধে পুলিশ যেসব মামলা দিয়েছে, কোনোটিতেই সে জড়িত নয়। শুধু সংগঠনে পদ থাকার কারণে একের পর এক মামলা দেওয়া হচ্ছে।