বছরের একমাত্র স্বপ্ন বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। শুরুটা ভালো হওয়ায় কৃষকের চোখে মুখেও ছিল খুশির আমেজ। কিন্তু হঠাৎ কৃষকের স্বপ্নে নজর লাগে প্রকৃতির। বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তলিয়ে যায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। নষ্ট হয় কিশোরগঞ্জের হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্ন। ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করে তা হারিয়ে ফেলেছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা তারা।
এমন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মিলেছে কিছুটা স্বস্তির আশ্বাস। কৃষকদের তিন মাস দেওয়া হবে সরকারি প্রণোদনা। হয়তো ক্ষতি না পোষালেও পরিবার নিয়ে দু’বেলা খেয়ে বাঁচতে পারবেন কৃষকরা। কিন্তু সরকার ঘোষিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার জন্য প্রাথমিক তালিকা তৈরি করার পরও আবার চলছে যাচাই-বাছাই। এখনও বাজেট চাওয়া হয়নি মন্ত্রণালয়ে। ফলে কবে নাগাদ সরকারি সহায়তা পাবেন তা চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, জেলার ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষকরা রয়েছেন চরম বিপাকে। পরিবার নিয়ে দিশেহারা তারা। রয়েছে ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ। এমন জটিলতায় সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতার দ্রুত বাস্তবায়ন চান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
বৃষ্টি আর উজানের ঢলে প্রায় ৩ একর জমির ধান হারিয়েছেন অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক আজমল মিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার যে ক্ষতিপূরণ দিতাছে, হেইড্যা (সেটা) আর কয় টেহা (টাকা)। বড় জোর দুই, চার, পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু আমরার (আমাদের) মতো কৃষকের যে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি হইছে, হেই ভর্তুকি কি কমানো যাইবো?’ এমন হাজারও প্রশ্নে জর্জরিত হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
হতাশায় বিবর্ণ ইটনা হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঋণ পরিশোধ করমু (করবো) না সংসার চালামু (চালাবো) এই চিন্তায় চক্ষে (চোখে) ঘুম আয় না (আসে না)। সরকার কইছে কৃষকের পাশে আছে। তিন মাস পরিবার চালাইতে টেহা দিবো, কিন্তু কই? খালি লিস্টি (তালিকা) আর লিস্টি। অমুক কাগজ দেও, তমুক কাগজ দেও। আর পারতাছিনা রে ভাই। এইবার অন্তত সরকার আমরারে একটু দেহুক (দেখুক)।’
কিশোরগঞ্জের হাজার হাজার কৃষকের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরের যেসব কৃষকের ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তাদের তিন মাসের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। সে মোতাবেক আমরা একটি তালিকা তৈরি করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রত্যেক উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন। তবে তা মন্ত্রণালয়ে এখনও পাঠানো হয়নি। মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন করা হবে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের হাওরে তিন ক্যাটাগরিতে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পাবেন সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হবে পাঁচ হাজার টাকা এবং যাদের তুলনামূলক কম ক্ষতি হয়েছে তারা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে আগামী তিন মাস অর্থ পাবেন। এ ছাড়া প্রত্যেককে প্রতি মাসে দেওয়া হবে বিশ কেজি করে চাল।’
তালিকা প্রস্তুতির ব্যাপারে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা বলেন, ‘তিন ক্যাটাগরিতে তালিকা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কম ক্ষতিগ্রস্ত এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। প্রথমে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেটিকে স্বচ্ছ করতে এখন নতুন করে তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হলেই বাজেটের জন্য পাঠানো হবে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। তারপর বরাদ্দ আসলে আমরা তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের প্রণোদনা দিতে পারবো।’
জেলায় এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। যেখানে শুধু হাওরাঞ্চলেই আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর। এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চোখ সরকারি প্রণোদনার দিকে। অন্তত পরিবার নিয়ে চলার জন্য হলেও দ্রুত সরকারি প্রণোদনার অর্থ চায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষকদের পরিবারগুলো।
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন কিশোরগঞ্জ হাওরের এক কৃষক
সুনামগঞ্জে এখনও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হয়নি
সুনামগঞ্জে এবার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হয়নি, এটি আরও বাড়বে।
জেলায় কৃষক পরিবার আছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭০৫টি। কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক হলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। ভূমিহীন কৃষক ৪৯ হাজার ১২৪ জন। এর মধ্যে ৯৮ হাজার কৃষকের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইতিমধ্যে তালিকা তৈরি নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যুক্ত হয়ে পড়েছেন। যারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, তারা যেন সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ‘আমরা চাই ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষক সরকারঘোষিত সহায়তা পাক। এ ছাড়া আগামী মৌসুম শুরু হলে কৃষকদের সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ দিয়ে পাশে থাকতে হবে। ঋণগ্রস্ত কৃষকদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে।’
বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তলিয়ে যায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কাজ করছেন। সরকারঘোষিত বিশেষ সহায়তার বাইরে কৃষকদের কৃষি উপকরণ, আগামী মৌসুমে সার-বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়া যেতে পারে।’
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে করা সেটি এখন যাচাই-বাছাই হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত করে সেটি দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।’