Image description

আর কদিন বাদেই শুরু হতে যাচ্ছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। এটি এমন একটি আয়োজন যেখানে একেকটি গোল একজন মানুষকে রাতারাতি কিংবদন্তি বানিয়ে দেয়। কিন্তু ফুটবলের এই মহারণের ইতিহাসে এমন অনেক নায়ক আছেন, যারা একসময় কোটি মানুষের মুখে মুখে ফিরেছেন, অথচ সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে। কেউ রাজনীতির নিষ্ঠুরতায়, কেউ দুর্ঘটনায়, কেউ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে, আবার কেউ খ্যাতির নির্মম চাপের কাছে হার মেনেছেন।

বিশ্বকাপের আলো সবসময় পেলে, মারাদোনা, জিদান কিংবা মেসিদের ওপরই পড়ে। কিন্তু সেই আলোর বাইরেও ছিল কিছু মুখ—যারা কোনো এক গ্রীষ্মে ফুটবলকে বদলে দিয়েছিলেন, অথচ ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম আজ প্রায় নেই বললেই চলে। এমন কয়েকজনকে নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।

ডিফেন্ডার হয়েও দেশকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বকাপ

 

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অধিনায়ক হোসে নাসাজ্জি। তাকে বলা হতো ‘দ্য গ্রেট মার্শাল’। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন। অসাধারণ নেতৃত্ব, কঠোর ডিফেন্ডিং এবং মাঠে ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ছিলেন দলের প্রাণ।

উরুগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েও আজকের ফুটবল আলোচনায় তার নাম খুব কমই শোনা যায়। অথচ বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি যিনি তুলেছিলেন, তিনি ছিলেন নাসাজ্জি।

গোলকিপার হয়েও যিনি বিশ্বকাপ এনে দেন

১৯৩৪ সালে ইতালিতে বসেছিল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর। দেশটির তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি পুরো টুর্নামেন্টকে নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনীতে পরিণত করেছিলেন। সেই বিশ্বকাপে ইতালির গোলপোস্টে দাঁড়িয়েছিলেন এক লম্বা, শান্ত স্বভাবের গোলরক্ষক—জিয়ানপিয়েরো কম্বি।

আজকের প্রজন্ম তার নাম খুব কমই জানে। অথচ ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনি। ইতালি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফাইনাল—প্রতিটি ম্যাচে তার সেভ ইতালিকে বাঁচিয়েছিল। আধুনিক গোলকিপিংয়ের অগ্রদূতও মনে করা হয় তাকে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইতালির ফুটবল ইতিহাসে তার জায়গা দখল করে নেন আরও উজ্জ্বল তারকারা। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হয়েও তিনি রয়ে যান ইতিহাসের অতল গহ্বরে।

ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বজয়ের নায়ক

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে ১৭ বছরের এক কিশোর পেলের কথা। কিন্তু সেই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মিডফিল্ডার দিদি। তার পুরো নাম ভালদির পেরেইরা। মাঠে সবাই ডাকত ‘দিদি’ নামে। তিনি ছিলেন সেই ব্রাজিল দলের মস্তিষ্ক। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, পাসের জাদু, আক্রমণ সাজানো—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন দিদিই।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হলো, কখনো কখনো একজন কিংবদন্তির আবির্ভাব অন্যদের ছায়ায় ঢেকে দেয়। পেলের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দিদির অবদান ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে থাকে। অথচ ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গল্প তার নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ।

গুম হয়ে যাওয়া তারকা

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের আগে ফুটবলবিশ্বে এক ধরনের অহংকার ছিল। ইংল্যান্ড নিজেদের ফুটবলের জন্মদাতা মনে করত এবং ধারণা ছিল, বিশ্বকাপে তাদের সামনে কেউ দাঁড়াতেই পারবে না।

কিন্তু ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তের এক বিকেলে সেই অহংকার ভেঙে খানখান করে দেন এক সাধারণ স্কুলশিক্ষক। তার নাম জো গায়েটজেন্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলা হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত এই ফরোয়ার্ডের একমাত্র গোলেই ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে হেরে যায়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ছিল সেটি।

কিন্তু বিশ্বকাপের নায়ক হয়ে ওঠার পরও গায়েটজেন্সের জীবন সুখের হয়নি। হাইতিতে ফিরে গিয়ে তিনি স্বৈরশাসনের শিকার হন। ১৯৬৪ সালে তাকে ধরে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর আর কখনো তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ পরিণতিগুলোর একটি বয়ে বেড়ান এই বিশ্বকাপ নায়ক।

মারাদোনার আগে আর্জেন্টিনাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন যিনি

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীরা একজন মানুষের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করত—মারিও কেম্পেস। সেই বিশ্বকাপে ছয় গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে করেন জোড়া গোল। তার হাত ধরেই প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।

কিন্তু আট বছর পর যখন দিয়েগো মারাদোনা মেক্সিকোর আকাশে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরলেন, তখন পুরো আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস যেন নতুন করে লেখা হলো। মারাদোনার কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, ‘হ্যান্ড অব গড’ আর শতাব্দীর সেরা গোলের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকেন কেম্পেস। অথচ আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়ের মহানায়ক ছিলেন কেম্পেস।

ছিলেন গোলবারের ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ছিলেন লাদিসলাও মাজুরকেভিচ। উরুগুয়ের এই কিংবদন্তিকে তখন বলা হতো ‘দ্য ব্ল্যাক স্পাইডার’—কালো মাকড়সা। পেলের বিখ্যাত ডামি মুভের ম্যাচটিতেও গোলপোস্টে ছিলেন মাজুরকিয়েভিচ।

যদিও সেই মুহূর্ত ইতিহাসে পেলের নামেই রয়ে গেছে, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে তার অসাধারণ গোলরক্ষণের কথা এখন খুব কম মানুষই স্মরণ করে। অথচ অনেক ক্রীড়াপ্রেমীর মতে, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা গোলকিপার ছিলেন তিনি।

যে গোলকিপার ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছিলেন

১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই। মারাকানা স্টেডিয়ামের প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে বসেছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেই উৎসবকে শোকে পরিণত করেছিলেন উরুগুয়ের অধিনায়ক অবদুলিও ভারেলা ও গোলরক্ষক রদ্রিগেজ মাসপোলি।

মাসপোলি একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে ব্রাজিলকে হতাশ করেছিলেন। ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত সেই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। অথচ আজ যখন ১৯৫০ সালের কথা ওঠে, অধিকাংশ আলোচনায় তার নাম প্রায় অনুপস্থিত।

গোল্ডেন বুট জিতেও হারিয়ে গেলেন

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘মিরাকল অব বার্ন’। ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু হাঙ্গেরির সেই স্বর্ণযুগের দলটির সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন শান্দর কোচিশ।

টুর্নামেন্টে ১১ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন তিনি। হেড থেকে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তাকে বলা হতো ‘গোল্ডেন হেড’। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি না জেতার কারণে তার নাম আজ অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে সতীর্থ ফেরেন্স পুসকাসের খ্যাতির নিচে।

বিশ্বকাপ কাঁপিয়েও হতে পারেননি কিংবদন্তি

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে পোল্যান্ড ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে চমকপ্রদ দলগুলোর একটি। সেই দলের প্রধান অস্ত্র ছিলেন জেগশ লাতো। সাত গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন এবং পোল্যান্ডকে তৃতীয় স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। গতি, ফিনিশিং ও প্রতিআক্রমণে ছিলেন ভয়ংকর।

কিন্তু একই যুগে ইয়ুহান ক্রুইফ, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও পেলের উত্তরাধিকার নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে যে লাতোর নাম ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে দেশকে জেতান বিশ্বকাপ

পাওলো রসি, বিখ্যাত ‘টোটোনেরো’ বেটিং কেলেঙ্কারির কারণে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন দুই বছর। এই সময়ে তীব্র মানসিক অবসাদ ও স্ট্রেসের কারণে বিশ্বকাপের আগে তার শরীর থেকে প্রায় ৫ কেজি ওজন কমে যায়। তিনি এতটাই রোগা ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে ইতালির ক্রীড়া সাংবাদিকরা তাকে মাঠে ‘ভূত’ বলে উপহাস করেছিলেন।

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইতালির রাস্তাঘাটে তার নাম উচ্চারণ হলেই মানুষ রাগে ফেটে পড়ত। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বিশ্বকাপে ফিরলেও ফর্ম ছিল না, আত্মবিশ্বাস ছিল না, সমর্থকদের আস্থাও ছিল না। প্রথম চার ম্যাচে একটি গোলও পাননি রসি। মনে হচ্ছিল, তার বিশ্বকাপ এখানেই শেষ।

কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে অসম্ভব গল্পও লিখে ফেলে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের বিপক্ষে তিনি একাই করলেন হ্যাটট্রিক। তারপর সেমিফাইনাল ও ফাইনালেও গোল। ছয় গোল করে জিতলেন গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং বিশ্বকাপ—তিনটিই।

তবু আজ ১৯৮২ সালের ইতালির কথা উঠলে অনেকে বেশি মনে রাখেন দেশটির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ডিনো জফ কিংবা সেই দলের রক্ষণভাগকে। অথচ পুরো বিশ্বকাপের ভাগ্যটাই বদলে দিয়েছিলেন রসি।

ছোট্ট একটি দেশকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ছিল স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নবীন রাষ্ট্র তখনও নিজের পরিচয় খুঁজছে। সেই সময় পুরো জাতির আশা হয়ে উঠেছিলেন ডেভর শুকার। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, জাপান—যার সামনেই দাঁড়িয়েছেন, গোল করেছেন। ছয় গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। তার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়া তৃতীয় স্থান অর্জন করে, যা তখন অকল্পনীয় সাফল্য ছিল।

কিন্তু সেই বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্র ছিল জিনেদিন জিদান ও স্বাগতিক ফ্রান্সের প্রথম শিরোপা। ফলে শুকারের অসাধারণ গল্পটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। আজও ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে তিনি কিংবদন্তি, কিন্তু বিশ্বফুটবলের আলোচনায় তার নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়।

রোনাল্ডোর আলোতে ঢাকা পড়েন ব্রাজিলের নায়ক

২০০২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপার গল্প বলতে গেলে সবার আগে আসে রোনাল্ডো নাজারিওর নাম। কিন্তু সেই দলের নীরব স্থপতি ছিলেন রিভালদো।

টুর্নামেন্টজুড়ে পাঁচ গোল, অসংখ্য আক্রমণ এবং প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই ছিলেন জয়ের নির্ধারক। তবু বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর আট গোল আর বিখ্যাত চুলের স্টাইলের আড়ালে রিভালদোর অবদান অনেকটাই হারিয়ে গেছে। অথচ ২০০২ সালের ব্রাজিলকে বুঝতে হলে রিভালদোকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দেশের শিরোপা হাতছাড়ায় যার কীর্তিও এখন ম্লান

২০১০ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ওয়েসলি স্নাইডারের। পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচ গোল করেছিলেন তিনি। ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার দুটি গোলই বদলে দিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য। আক্রমণ তৈরি করা, গোল করা, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই ছিলেন অনবদ্য।

অনেকের মতে, সেই বছর ব্যালন ডি’অরের সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার ছিলেন স্নাইডার। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর তার কীর্তি অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। আজ যখন ২০১০ সালের বিশ্বকাপের কথা বলা হয়, অধিকাংশ মানুষ মনে রাখে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোল কিংবা স্পেনের টিকি-টাকা ফুটবল। অথচ নেদারল্যান্ডসকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নেওয়া স্নাইডারের অবদান ছিল সমানভাবে ঐতিহাসিক।