Image description

‘আমার মেয়েটা কই? ও স্কুলে যাবে, ভাত খাবে। ও তো একা খেতে পারে না...’—বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন পারভিন বেগম। সকালে বাসাভর্তি মানুষ, সাংবাদিকদের আনাগোনা; কোনো কিছুতেই খেয়াল নেই তার। সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। আর ফাঁকে ফাঁকে জ্ঞান ফিরলে এমন বিলাপ করছেন।

গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে পারভিন বেগমের মেয়ে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ।

বুধবার পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকদের জানান, রাজধানীর পল্লবীর পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল রামিসা আক্তার। রোল নম্বর ছিল এক। প্লে ও কেজিতে দ্বিতীয় হওয়ার পর প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে সে। পড়াশোনায় মনোযোগী ছোট্ট মেয়েটি প্রতিদিন সময়ের আগেই স্কুলে চলে আসত। মঙ্গলবার সকালেও স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রামিসা। 

তার মা পারভিন বেগম ভেবেছিলেন, বড় বোন রাইসার সঙ্গে সে পাশের বিল্ডিংয়ে চাচার বাসায় গেছে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মেয়ের চিৎকার শুনে খুঁজতে বের হন তিনি। পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে থাকতে দেখেন রামিসার একটি জুতা। বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও কেউ খুলছিল না। পরে আশপাশের লোকজন এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে।

সাংবাদিকরা যখন ফুটফুটে শিশুটির হত্যাকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করছেন, সেসময়ে রামিসার মরদেহ গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ময়নাতদন্ত শেষে রামিসার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিকেল ৪টায় পল্লবীতে রামিসার জানাজা অনু‌ষ্ঠিত হয়। পরিবারের সদস্যরা সবাই ব্যস্ত। সাংবাদিকদের রামিসার ঘর দেখিয়ে দিচ্ছিল তার বড় বোন রাইসা আক্তার। এসময় ঘরে সাজানো ট্রফিগুলো দেখিয়ে সাংবাদিকদের সে বলছিল, ‘আমার বোন ভালো ছাত্রী ছিল। সে পড়াশোনায় ছিল খুব মনোযোগী।’
 
শুধু পড়াশোনা নয়, ছোট্ট মেয়েটির ছিল প্রাণীদের প্রতিও আলাদা মায়া। একটি বিড়াল আর কয়েকটি পাখি পুষত সে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, নিজের খাবার ঠিকমতো খেতে না পারলেও বিড়ালটাকে নিজের হাতেই খাওয়াত রামিসা। ঘটনার পর থেকে বিড়ালটাও চুপচাপ হয়ে গেছে।

এদিকে মেয়ের শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লাও। হতাশার সুরে তিনি বলছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই।’

বুধবার সকাল থেকে রামিসার বাসার সামনে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করেন। সবার কণ্ঠে একটাই দাবি—এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।