Image description

আবারও খুন। আবারও নৃশংসতা। এবার রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের ফুটফুটে এক মেয়েশিশুকে খুন করা হয়েছে গলা কেটে। ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে মাথা। লামিসা নামের মেয়েটির মাথা মিলেছে বাথরুমে আর শরীরের বাকি অংশ ছিল খাটের নিচে। তার সঙ্গে এমন ভয়াবহ ঘটনার দিন জানা গেল, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে একজনকে হত্যার পর কেটে নেওয়া হয়েছে ডান হাত। একই দিন পাওয়া গেল চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার একটি বাসা থেকে গৃহশিক্ষিকার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের খবর।

অথচ উল্লিখিত তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রে হত্যার নেপথ্যে তেমন বড় কারণ ছিল না বলেই জানা গেছে প্রাথমিক তথ্যে। সামান্য স্বার্থ কিংবা ছোট্ট বিরোধের জেরে এমন হত্যাকাণ্ডগুলো যেন ‘পান থেকে চুন খসলে’র মতো ঘটনা।   

পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার সকালে লামিসার মরদেহ উদ্ধারের পর জানিয়েছে, খুন হওয়ার আগে ছোট্ট মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলেও তাদের ধারণা। বাগেরহাটের ঘটনার নেপথ্যে জমিজমা নিয়ে বিরোধ। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের হত্যার কারণ হতে পারে একজোড়া কানের দুল।

তার আগের দিনই মাদারীপুরের একটি ঘরে পড়ে ছিল মা-বাবা ও সন্তানের মরদেহ। গত ১৪ মে মুগদার মাণ্ডা এলাকায় এক সৌদিপ্রবাসীকে হত্যার পর আট টুকরো করা হয়। এক সপ্তাহ আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে হত্যা করেন এক ব্যক্তি।

পল্লবী, বাগেরহাট, মুগদা কিংবা কাপাসিয়ার মতো প্রতিনিয়ত দেশের কোনো না কোনো স্থানে নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা এসব খুন দেখছেন সামাজিক অস্থিরতা হিসেবে। তারা বলছেন, এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; বরং ভয়ংকর এক সামাজিক অশনিসংকেত।

কান্না করায় কোলের শিশুকে হত্যা, কিংবা মা বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে সন্তানদের খুন অথবা প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে প্রিয় সন্তানকে খুন করা যেন দুধভাত হয়ে উঠেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। ২০২৫ সালে সারা দেশে খুন ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৬টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৪৪২ ও ২০২৩ সালে হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ২৩টি।

গত চার মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে দেশে ২৬৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ঢাকা রেঞ্জে। গত এপ্রিল মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ২৮৮টি, মার্চে ৩১৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও জানুয়ারিতে ২৮৭টি। ঢাকা মহানগরী এলাকায় গত চার মাসে ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬, মার্চে ২৪ এবং এপ্রিলে ১৭টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের চার মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে দেশে ২৬৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ঢাকা রেঞ্জে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের ভাষ্য, পারিবারিক অশান্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ছোটখাটো পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। মনোমালিন্য কেন্দ্র করে পরিবারে একাধিক পক্ষ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে জিঘাংসা।

তৌহিদুল হক মনে করছেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, দৃশ্যমান বিচারের ঘাটতির প্রতিফলন ঘটছে সমাজে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার মনে করেন, সমাজ-সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মানসিক প্রস্তুতির একধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে মানুষ এখন বহির্বিশ্বের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সেই বাস্তবতার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি আমাদের নেই। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই ‘কালচারাল ল্যাক’।

‘গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা রাগ, হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা দ্বন্দ্ব অনেক সময় ভয়ংকর সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে’— যোগ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। কারণ, একটি পরিবার ধ্বংস হওয়া মানে শুধু কয়েকটি প্রাণ হারানো নয়, একটি সমাজের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে মানবিকতার আলো নিভে যাওয়া।

মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের ভাষ্য, খুনের ঘটনা দুই ধাপে হয়ে থাকে। একটি হলো পরিকল্পিতভাবে, আরেকটি হঠাৎ রাগ-ক্ষোভ থেকে। তবে একজন মানুষ এমনিতেই ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে না। যখন অনেক ক্ষোভ একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই এমন বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটায়। এর পেছনে স্কুল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। সর্বোপরি শিশুর শৈশব থেকে শুরু করে তার পরিণত বয়সে ব্যক্তিত্ব বিকাশের জায়গায় যদি কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, তখনই মানুষের ভেতরে এ ধরনের হিংস্রতা, বীভৎসতা তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত মামলা নেওয়া, সঠিক তদন্ত করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ। তার মতে, এমন ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও ভয় পাবে। সমাজে কমবে অপরাধপ্রবণতা।