Image description

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবারও কেন্দ্রীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার, আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য এবং অন্তর্বর্তী-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার, আওয়ামী লীগ এখনও নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরে মনে করছে না। বরং তারা বিশ্বাস করতে চাইছে, বর্তমান সংকট সাময়িক এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দলটি আবারও ফিরে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রত্যাবর্তনের ভাষা কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন, নাকি এটি মূলত কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার কৌশল?

 

শেখ হাসিনার বক্তব্যের ভাষা লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনি নিজেকে কেবল ক্ষমতাচ্যুত একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন না; বরং রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার, বারবার মৃত্যুচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং ইতিহাসের ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। “আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে”, “আমি মাথা উঁচু করে ফিরব,” এই ধরনের বাক্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এগুলো আবেগ-নির্ভর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভাষা। তিনি জানেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশ এখনও আবেগ ও ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্যে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে তাঁর এই ভাষা মূলত দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে একটি বার্তা—দল ভেঙে পড়েনি, নেতৃত্ব এখনও লড়াইয়ে আছে।

এখানে আরেকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা তাঁর সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে টেনে এনেছেন। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের “ভারত-তোষণ” অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে তিনি গঙ্গা পানি চুক্তি, সমুদ্রসীমা মামলা ও স্থলসীমান্ত চুক্তির উদাহরণ দিয়েছেন। এটি নিছক আত্মপক্ষ সমর্থন নয়। বরং এটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশেও একটি সূক্ষ্ম স্মরণ করিয়ে দেওয়া, আওয়ামী লীগই ছিল দিল্লির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। সেই বাস্তবতায় হাসিনা যেন বলতে চাইছেন, “আমাদের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।”

তবে এটাও সত্য, দিল্লি এখন আগের অবস্থানে নেই। ভারত বাস্তববাদী কূটনীতি করে। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, দিল্লি শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গেই কাজ করে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত দ্রুত সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগত স্বার্থ, এসব কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া আর তাঁকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরানোর জন্য সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া, দুই বিষয় এক নয়। ভারত হয়তো তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দেবে না, কিন্তু সেটি এই অর্থও বহন করে না যে দিল্লি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনকে কৌশলগতভাবে নিশ্চিত করতে চায়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও আওয়ামী লীগের জন্য সহজ নয়। গত দেড় দশকের শাসনামল নিয়ে সমাজের বড় একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটবিহীন নির্বাচন, বিরোধী দমন, দুর্নীতির অভিযোগ, এসব স্মৃতি এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ফলে শুধুমাত্র “ইতিহাসে আমরা ফিরেছি” ধরনের বক্তব্য জনমতের বাস্তব সংকট দূর করতে পারবে না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ, যারা সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনৈতিক বয়ানকে সহজে গ্রহণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এই বাস্তবতায় মাহফুজ আলমের ফেসবুক পোস্টটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হলো, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের জন্য কেবল আওয়ামী লীগ দায়ী নয়; বরং অন্তর্বর্তী শাসনের ব্যর্থতা, উগ্র ডানপন্থার উত্থান, মব-রাজনীতি এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার দুর্বলতাও দায়ী। এটি নিছক আবেগী পোস্ট নয়, বরং ক্ষমতান্তর-পরবর্তী রাজনীতির একটি আত্মসমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। তিনি যে কথাটি বলতে চেয়েছেন তা হলো, যদি গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পুরনো শক্তি আবার ফিরে আসার সুযোগ পায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসও সেটাই বলে। আওয়ামী লীগকে ১৯৭৫-এর পর নিশ্চিহ্ন মনে করা হয়েছিল। বিএনপিকেও একাধিকবার “শেষ” ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বড় দল পুরোপুরি বিলীন হয়নি। কারণ এখানে রাজনীতি কেবল আদর্শের নয়, সামাজিক শিকড়, প্রশাসনিক প্রভাব, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণেরও খেলা। আওয়ামী লীগের এখনও একটি বড় সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব একদিনে মুছে যায়নি। ফলে দলটি রাজনীতিতে টিকে থাকবে, এটি বাস্তবসম্মত ধারণা। কিন্তু টিকে থাকা আর পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসা এক বিষয় নয়।

শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের আরেকটি লক্ষ্য সম্ভবত বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া। বার্তাটি হলো—আওয়ামী লীগকে প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করা গেলেও রাজনৈতিকভাবে শেষ করা যায়নি। এটি বিএনপির জন্যও একটি সতর্কতা। কারণ বাংলাদেশে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের জন্যই স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারাও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।

তবে বিএনপি সরকারের ভেতর থেকেও ভিন্ন ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে। জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে সেই ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর প্রতিও “ইনসাফ” থাকবে এবং বিচারবহির্ভূত কিছু করা হবে না। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি গণতান্ত্রিক বার্তা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিহিংসাহীন ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বিচার ও রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে শেখ হাসিনার বিচার প্রশ্নটি কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

সবশেষে, শেখ হাসিনার ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার আসলে বহুস্তরীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ। এটি দলীয় কর্মীদের সাহস দেওয়ার চেষ্টা, ভারতের কাছে পুরনো সম্পর্ক স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা এবং বর্তমান সরকারের প্রতি রাজনৈতিক চাপ, সবকিছুর সমন্বয়। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা শুধু বার্তায় নির্ধারিত হয় না। প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সুযোগ, জনসমর্থনের পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, অতীতের ভুল নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য আত্মসমালোচনা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল পুরনো দুই শক্তির ক্ষমতার পালাবদল দেখতে চায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ গত এক দশকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে গভীর ক্লান্তি জমেছে। মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু সেই স্থিতিশীলতা যেন স্বাধীনতা ও জবাবদিহির বিনিময়ে না হয়। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বার্তা রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন তুললেও সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর—বাংলাদেশ কি অতীতের পুনরাবৃত্তি চায়, নাকি নতুন রাজনৈতিক চুক্তির দিকে এগোতে চায়?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট