বিষয়টি এলার্মিং। হামে কেবল শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে না। সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্করাও। গতকাল পর্যন্ত হামের জন্য বিশেষায়িত সিলেটের শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮০ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী। সর্দি, জ্বরের সঙ্গে তাদের শরীরে রেশও ছিল। বর্তমানে শামসুদ্দিনে ভর্তি রয়েছেন ২২ জন রোগী। হামের উপসর্গ দেখা দেয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২২ বছর বয়সী এক যুবক সুনামগঞ্জ জেলা হাসপাতালের কর্মচারী। হাসপাতাল থেকেই সে হাম সংক্রমণ হয়। ওই যুবক মানবজমিনকে জানিয়েছেন- প্রথমে সর্দি জ্বর ছিল। এরপর শরীরে রেশ দেখা দেয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সিলেটে বাড়ি ২৫ বছর বয়সী এক মহিলা জানিয়েছেন- নবজাতক সন্তানকে নিয়ে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
ছেলে সুস্থ হওয়ার পর তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালের নথি ঘেঁটে জানা গেছে; যেসব প্রাপ্তবয়স্করা হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তারা কোনো না কোনো ভাবে হামের রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। এ কারণে পরবর্তীতে তারা হাম রোগে আক্রান্ত হন। দিরাই উপজেলার ২০ বছর বয়সী এক যুবকের স্টোরি ব্যতিক্রম। সে ধান কাটতে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়। এরপর হামে উপসর্গ দেখা দেয়। পরবর্তীতে হাম নিয়ে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি হন।
প্রথমে শ্বাসকষ্ট থাকলেও এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। এদিকে- গতকাল শামসুদ্দিন হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ড ঘুরে জানা গেছে; ব্যতিক্রম ভাবে অনেক রোগীও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে আসা এক শিশু তিন সপ্তাহ আগে হামের টিকা নিয়েছিলেন। টিকা নেয়ার পর হামে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এই তিনটি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা বেশির ভাগ রোগীই আগে টিকা নেননি। সদর উপজেলার এক শিশু জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি। আর টিকা না দেয়ার কারণেই ওই শিশু হামে আক্রান্ত হয়।
সিলেটে হামের এই নানা ভ্যারিয়েশনে হতাশ নয় চিকিৎসকরা। তারা জানিয়েছেন- চিকিৎসা আছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। সিলেটের পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. পিয়া বিশ্বাস মানবজমিনকে জানিয়েছেন- যেসব শিশু টিকা দেয়ার পর আক্রান্ত হয়েছেন তার মানে এই নয় যে, টিকা দেয়ার পরও তারা আক্রান্ত হয়েছেন। টিকা গ্রহণের আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছিলেন।
টিকা দেয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন- হাম আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই উপসর্গ নিয়েও দেরিতে ডাক্তারের কাছে আসেন। ফলে বিলম্বে তাদের চিকিৎসা শুরু হয়। এ কারণে পিআইসিইউ বা এসডিইউ’র সাপোর্ট নিতে হচ্ছে অনেকেই। তিনি বলেন- হাম উপসর্গ দেখা দিলেই যেন চিকিৎসকের কাছে রোগীরা আসেন। প্রথম থেকেই চিকিৎসা দিলে রোগী জটিল পর্যায়ে পৌঁছাবে না। এজন্য তিনি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন- অনেক প্রাপ্তবয়স্ক রোগী তার হাসপাতালে এসে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে জানান তিনি। এদিকে- সিলেটে হামের চিকিৎসা সেবার জন্য সরকারি ভাবে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এতে করে রোগীরা সেবা পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলার সিভিল সার্জন নাসির উদ্দিন। তিনি জানান- আইসোলেশন ওয়ার্ড, এসডিইউ, পিআইসিইউ’র সংকট নেই। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন- সিলেটে টিকাদান কর্মসূচি শতকরা ৯৭ পার্সেন্ট সফল হয়েছে। আরও একদিন প্রথম ধাপে ঠিকাদান কর্মসূচি চলবে। যারা বাকি থাকবে তাদের পর্যায়ক্রমে টিকা দেয়া হবে বলে জানান তিনি। বলেন- আগামী দুই মাসের মধ্যে সিলেটে হামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সিলেটে একদিনে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে।
নতুন করে আরও ৯২ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ২৮১ জন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৭০ ও ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৭ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। মারা যাওয়া ৪০ জনের মধ্যে ৪ জন নিশ্চিত হামে ও ৩৬ জন উপসর্গে মারা গেছে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুনির ওমর রাশেদ জানান- হামের প্রকোপ বাড়ায় ওসমানী হাসপাতালে ২০টি ও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৪টি আইসিইউ বেড সংযোজন করা হয়েছে।