ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে বাঁশের সাঁকো ভেঙে যাওয়ার পর গত ১৯ দিন ধরে কলাগাছের ভেলায় চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শীলা নদী পার হচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী ও কৃষকরা।
উপজেলার সান্দিয়াইন ও পাড়া সান্দিয়াইন গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত শীলা নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ১৯০ ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোটি গত ৩০ এপ্রিল অতিবৃষ্টি ও স্রোতের তোড়ে ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এরপর থেকেই কলাগাছের ভেলা এই এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা।
সান্দিয়াইন নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে কলাগাছের ভেলায় নদী পার হয়ে স্কুলে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে জানায়, নদীতে অনেক পানি আর স্রোত থাকায় খুব ভয় লাগে। মাঝেমধ্যে মনে হয় এই বুঝি নদীতে পড়ে যাবে। সাঁতারও ভালো জানে না সে।
একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আকলিমা খাতুন বৃষ্টির ভাষ্য, ‘সাঁকো ভেঙে যাওয়ার পর তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আসার সময় ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে কলাগাছের ভেলায় চড়ে নদী পার হয়েছি। মাঝ নদীতে এসে কলাগাছের ভেলা যেভাবে দোল খাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে গেলাম। পড়ে গেলে কাপড়চোপড়, বইপত্রসহ সবকিছুই তো নষ্ট হতো।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই ঘাটে গত কয়েক বছরে বাঁশের সাঁকো থেকে পড়ে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীও ছিল। এ কারণেই এলাকাবাসী ঘাটটির নাম দিয়েছে ‘শনির ঘাট’।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের সান্দিয়াইন, পাড়া সান্দিয়াইন, ছয়ানি রসুলপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ প্রতিদিন এই পথে চলাচল করেন। নদীর উত্তর পাড়ে রয়েছে একটি বালিকা দাখিল মাদ্রাসা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দক্ষিণ পাড়ে রয়েছে একটি বালক দাখিল মাদ্রাসা ও আরেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ছোট ছোট শিক্ষার্থীদেরও ঝুঁকি নিয়ে ভেলায় নদী পার হতে হচ্ছে।
পাড়া সান্দিয়াইন গ্রামের বাসিন্দা ইসহাক মিয়া বলেছেন, বাজার করতে যেতে হলেও কলাগাছের ভেলায় নদী পার হতে হয়। বয়স বেশি হওয়ায় ভেলা থেকে পড়ে গেলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
সান্দিয়াইন গ্রামের শিহাব উদ্দিন জানান, বিভিন্ন এলাকায় মালামাল ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। প্রতিদিন নদী পার হতে হয় কলাগাছের ভেলায়। বিশেষ করে রাতে চলাচলে বেশি ভয় লাগে।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মাহবুবুল আলম বলেছেন, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ার পর কয়েকটি গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প হিসেবে নয়াপাড়া সেতু ব্যবহার করা গেলেও সেখানে যেতে প্রায় সাত কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। আবার পাড়া সান্দিয়াইন গ্রাম থেকে নয়াপাড়া সেতু পর্যন্ত পায়ে হাঁটার পথ ছাড়া অন্য কোনো সড়ক নেই। তাই বাধ্য হয়েই সবাই কলাগাছের ভেলায় নদী পার হচ্ছেন।
তিনি দ্রুত অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা এবং স্থায়ীভাবে একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানান।
রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, বিষয়টি এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু বকর ছিদ্দিক বলেছেন, সেখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। দ্রুত তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।