Image description

মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। দফায় দফায় পুনর্গঠন, নীতিছাড়, রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সুবিধা পেয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পদ্মা ব্যাংক। ভয়াবহ আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটিকে নিয়ে এখন অবসায়ন (বন্ধ) অথবা একীভূতকরণের চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পদ্মা ব্যাংকের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের প্রায় পুরো অংশই এখন আদায় অযোগ্য।

একই সময়ে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকায়। এর আগে জুন শেষে যা ছিল ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা নেমে গেছে ঋণাত্মক ১৫০ দশমিক ২৭ শতাংশে।

বর্তমান সংকটের শিকড় ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই ঋণ জালিয়াতি ও ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পুনর্গঠন করা হয় পরিচালনা পর্ষদ। পদ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। একই সময়ে অপসারণ করা হয় তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও।

পরবর্তীতে ব্যাংকটির দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির তকমা থেকে বেরিয়ে আসতে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড’।

একই সঙ্গে মালিকানায় বড় পরিবর্তন আনে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় চার ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ব্যাংকটির ৬৮ শতাংশ শেয়ার গ্রহণ করে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো ৭১৫ কোটি টাকার পুঁজি জোগান দেয়। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা মেয়াদি আমানত ও কলমানিও এখনো পদ্মা ব্যাংকে আটকে আছে।

বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ছাড় দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২৫২ কোটি টাকার তারল্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। উল্টো ঋণ থেকে আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকটি এখন আমানতের সুদ পরিশোধেও হিমশিম খাচ্ছে।

গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। এর বড় অংশই উচ্চ সুদের আমানত হওয়ায় প্রতিবছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যাংকটিকে। বিদেশি বিনিয়োগ আনার যে প্রতিশ্রুতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দিয়েছিল, তারও কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন থেকে ব্যাংকটিকে অবসায়ন অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়। সম্প্রতি ব্যাংকটি নতুন করে ৪ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাইলে সেটিও নাকচ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— নতুন করে আর কোনো অর্থ সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়। সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে সহায়তা নেওয়া অথবা অবসায়নের পথ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পদ্মা ব্যাংক নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমানে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর পদ্মা ব্যাংকের মতো অতি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।