দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ১১ ও ১২ মে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত বিষয়ে এস. আলম গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, ইঙ্গিত, বর্ণনা ও সিদ্ধান্তের অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলো অনুমাননির্ভর, একপক্ষীয় ও অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর।
প্রতিবেদনসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে তথ্য, ব্যক্তিগত অভিমত, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, শ্রুতকথানির্ভর অভিযোগ এবং বহু বছর পর প্রদত্ত কাল্পনিক স্মৃতিনির্ভর বক্তব্যকে একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করে একটি পূর্বনির্ধারিত ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ এত গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপনের পরও প্রতিবেদনে কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায়, নিরপেক্ষ বিচারিক অনুসন্ধান, নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অনুপস্থিত।
‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘প্রযোজিত বোর্ডসভা’, ‘জোরপূর্বক পদত্যাগ’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুতর ও পক্ষপাতমূলক শব্দ ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ– উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকসহ কোনো আদালত-স্বীকৃত সিদ্ধান্ত, প্রামাণিক নথি বা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়নি। ‘একাধিক সূত্র’, ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল মহল’ বা অতীতের ঘটনা-সম্পর্কিত ব্যক্তিগত বক্তব্যের নামে বর্ণিত কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘জোরপূর্বক’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি গুরুতর শব্দ ব্যবহার সাংবাদিকতার ন্যূনতম ভারসাম্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কার্যকলাপগুলোর উদ্দেশ্য হতে পারে একটি বিশেষ আবহ তৈরি করা–যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।
ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন ও তথাকথিত ‘ব্যাংক দখল’ প্রসঙ্গে
দৈনিক প্রথম আলো ইসলামী ব্যাংকের ২০১৭ সালের বোর্ড পুনর্গঠনকে ‘ব্যাংক দখল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও পক্ষপাতদুষ্ট। বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও তদারকি ছাড়া সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।
যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো ‘অবৈধ দখল’ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে– গত প্রায় এক দশকে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কি সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে? প্রতিবেদনে এর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যেন ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক ইচ্ছায় সংঘটিত হয়েছিল। অথচ বাস্তবে সে সময়কার নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কমপ্ল্যায়ান্স-প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের মাধ্যমেই এসব পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রমাণিত।
প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় পূর্বে ব্যবহৃত ভাষা ও পরিভাষার তুলনায় বর্তমান উপস্থাপনায় একটি ভিন্ন ব্যাখ্যামূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সে সময় যেসব পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্তিপূর্ণ’ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, পরবর্তীতে একই ঘটনাক্রমকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যাখ্যামূলক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বর্ণনাগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। ফলে অতীতের ঘটনাকে বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে পুনর্ব্যাখ্যা করে ভিন্ন অর্থ আরোপ করার এই প্রবণতা প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা ও উপস্থাপনার ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনজুড়ে বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘ডিজিএফআই-প্রযোজিত সভা’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘চাপ প্রয়োগ’ ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করা হলেও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক সংযোগ, লিখিত প্রমাণ, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন নেই।
কোন সভায় কে উপস্থিত ছিলেন, কে কাকে চিনতেন অথবা কে কোথায় গিয়েছিলেন– এসব পরিস্থিতিভিত্তিক বর্ণনা থেকে অবৈধ ষড়যন্ত্র বা জবরদস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা অগ্রহণযোগ্য এবং পেশাগতভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথিত আচরণ এবং কোনো বেসরকারি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আইনগত দায় একেবারেই ভিন্ন বিষয়। এই দুই স্বতন্ত্র বিষয়কে একত্রে উপস্থাপন করা নিছক বিভ্রান্তিকর সংমিশ্রণ ছাড়া কিছু নয়।
আরাস্তু খান ও অন্য সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে
সাবেক চেয়ারম্যান আরাস্তু খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল– এমন দাবি প্রতিবেদনে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হলেও এর পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ, অডিও, ভিডিও, লিখিত নির্দেশনা বা আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট সময়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল ভিন্নধর্মী।
এ ছাড়া যে ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেমন– জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম ব্যক্তিগতভাবে আরাস্তু খানের বাসায় গিয়ে তাকে ‘স্টেপ ডাউন’ করতে বলেছেন– এ ধরনের আচরণ বা ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের চাপ প্রয়োগের চরিত্র এস. আলম গ্রুপের সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলমের পরিচিত ব্যক্তিত্ব, করপোরেট আচরণ এবং ব্যবসায়িক কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে, তিনি এ ধরনের সরাসরি ব্যক্তিগত চাপ প্রয়োগ, কারও ব্যক্তিগত পরিসরে যাওয়া বা করপোরেট শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করার মতো আচরণে সম্পৃক্ত নন।
করপোরেট বাস্তবতায় চেয়ারম্যান, পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন, মতবিনিময় কিংবা নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। বহু বছর পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, পরবর্তী সময়ে দেওয়া বক্তব্যসমূহ যদি পরিস্থিতিগত সুবিধা গ্রহণ বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়ে থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ববর্তী ঘটনাকে প্রমাণিত সত্যে পরিণত করে না। কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য, সমসাময়িক ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক, যা আলোচ্য প্রতিবেদনে নেই।
একইভাবে প্রতিবেদনে বিভিন্ন সাবেক কর্মকর্তা বা পরিচালকের ব্যক্তিগত অভিমতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সেগুলো আদালত-স্বীকৃত প্রকৃত সত্য নিরূপণ। অথচ এসব বক্তব্যের কোনো স্বাধীন, নথিভিত্তিক বা বিচারিক যাচাই প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।
শেয়ার অধিগ্রহণ ও তথাকথিত ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে আত্মীয়তা, ব্যবসায়িক পরিচিতি বা পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে ‘একক গোপন নিয়ন্ত্রণ’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ বাংলাদেশের কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিটি নিবন্ধিত কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র সত্তা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক পরিচয় থাকা মানেই সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ একই উৎস থেকে পরিচালিত– এমন উপসংহার আইনসম্মত নয়।
প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো আইনগতভাবে নিবন্ধিত পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ও করপোরেট অংশীদারত্ব বিদ্যমান আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়েছে।
‘বেনামি’, ‘প্রক্সি’, ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘একক প্রভাব’-জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ বিষয়ে কোনো আদালতের রায়, উপকারভোগী মালিকানা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে নেই।
বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারকে শুধু চাপ, ভয়ভীতি বা পরিকল্পিত প্রভাবের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; অথচ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সাধারণত বাজার পরিস্থিতি, মুনাফা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের মতো বহুবিধ বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালক মনোনয়ন বা করপোরেট অংশীদারত্বের প্রতিটি ধাপই প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই, নথি দাখিল ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের আওতাভুক্ত। এতসব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন কার্যক্রমকে পরবর্তীকালে ‘গোপন দখল’ হিসেবে বর্ণনা করা বাস্তবতার অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়।
একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এস. আলম গ্রুপের ‘নিয়ন্ত্রণে’ ছিল। অথচ তালিকাভুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো, স্পন্সর অনুমোদন, পরিচালক নিয়োগ এবং মালিকানা বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়।
বেনামে শেয়ার ধারণ, গোপন নিয়ন্ত্রণ বা প্রক্সি মালিকানা-সংক্রান্ত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, যা বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন বা কোম্পানি ও সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী এসব বিষয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক তদারকির বাইরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা অনুমাননির্ভরভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, ব্যাংকের অডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোসহ সমগ্র নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। বাস্তবে এটি দেশের ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে অবমূল্যায়নের শামিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সম্পর্কেও অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে।
ঋণসুবিধা ও ব্যাংকিং এক্সপোজার প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঋণসুবিধাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ঋণের পরিমাণই অপরাধের প্রমাণ। অথচ শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, স্টিল, ভোগ্যপণ্য ও বৃহৎ আমদানিনির্ভর ব্যবসায় স্বাভাবিকভাবেই বড় অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ঋণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে অনুমোদিত হয়ে থাকে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, পুনঃতফসিল, বিনিয়োগ বা এক্সপোজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই, অভ্যন্তরীণ কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়। এই বহু পদক্ষেপভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত-প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে একটিমাত্র ব্যবসায়িক গ্রুপকে সমগ্র সিদ্ধান্ত কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিবর্জিত।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– এসব ঋণ সব সময় নিয়মিত ছিল, যথাযথ ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত ছিল এবং জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত গ্রুপটির কোনো ঋণ খেলাপি ছিল না। এই মৌলিক বাস্তবতা প্রতিবেদনে সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
২.২৫ লাখ কোটি টাকার তথাকথিত ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণ’-সংক্রান্ত উপস্থাপনাও বিভ্রান্তিকর। আমরা আগেও বলেছি যে, গ্রুপের সব ঋণ স্বচ্ছভাবে অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে প্রতিফলিত এবং অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই গৃহীত। এস. আলম গ্রুপের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী (যেখানে নিরীক্ষকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি কনফার্মেশনের দ্বারা প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত সমর্থন হিসেবে বিদ্যমান), ব্যাংকিং ডকুমেন্টেশন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিলকৃত তথ্যের সঙ্গে উপস্থাপিত এই অতিরঞ্জিত ঋণের পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান।
আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে পরস্পরবিরোধী ঋণের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং তথাকথিত এক্সপোজার উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে যেসব ঋণ বা প্রতিষ্ঠানের নাম এস. আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর সঙ্গে গ্রুপটির প্রত্যক্ষ বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। এ ধরনের যাচাইবিহীন সংখ্যা ও তথ্য উপস্থাপন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তারের ভিত্তিহীন অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ বা বিশেষ অনুমোদন আদায়ের অভিযোগও সম্পূর্ণরূপে উপাখ্যানমূলক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও বহু পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রকব্যবস্থা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রতিনিধি নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই যোগাযোগকে বেআইনি প্রভাব হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন, যা প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নির্ধারিত আইন, নীতিমালা, তদারকি ব্যবস্থা, পরিদর্শন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ ধরনের বহুস্তরীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে কোনো একক ব্যক্তি, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একতরফা প্রভাবাধীন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতা ও বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যপ্রণালির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
আন্তব্যাংক ডিপোজিট ও তারল্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের অন্যান্য ব্যাংকে ডিপোজিট-সংক্রান্ত বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এসব সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়ম বা পক্ষপাতের প্রমাণ। ব্যাংকিং খাতে লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আন্তব্যাংক আমানত একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত প্রথা। পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে অতীতের প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বা ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা মূলত মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা ছাড়া কিছু নয়।
বাজার পরিস্থিতি, তারল্য সহায়তা, ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামোর ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং স্বল্পমেয়াদি তহবিল বিনিয়োগ/ব্যবহারের নীতিমালার ভিত্তিতে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে সংশ্লিষ্ট সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব প্লেসমেন্টকে অবৈধ বা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছিল কি না।
ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের মতো বহুমাত্রিক কারণসমূহ উপেক্ষা করে এককভাবে একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ব্যাংক খাতের সব সমস্যার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিয়োগ, পদোন্নতি ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ, পদোন্নতি বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনকে ‘নিজেদের লোক বসানো’ হিসেবে উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তিকর। নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা, বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ শাখা বা চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিকে নেতিবাচক ইঙ্গিতসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ দেশের বৃহৎ ব্যাংকগুলোতে সম্প্রসারণ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং পরিচালনাগত পুনঃসমন্বয়ের অংশ হিসেবে ব্যাপক নিয়োগ ও দ্রুত পদোন্নতি অস্বাভাবিক নয়।
নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল বা জেলার ব্যক্তিদের নিয়োগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কেবল অনুমাননির্ভর নয়, বরং বৈষম্যমূলক ইঙ্গিতও বহন করে। কোন কর্মকর্তা বিশেষ অঞ্চল, জেলা বা সামাজিক পটভূমি থেকে এসেছেন– এটি অনিয়ম বা বেআইনি নিয়োগের প্রমাণ হতে পারে না। আঞ্চলিক পরিচয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা যোগ্যতা ও দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করে।
বাংলাদেশে ব্যাংকসমূহের নিয়োগ কার্যক্রম কঠোর আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার আওতায় পরিচালিত হয় এবং এটি সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। ইসলামী ব্যাংকেও সব সময় প্রবেশনারি অফিসার, সিনিয়র অফিসার বা সমমানের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই, লিখিত পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার এবং বোর্ড/কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো স্বচ্ছ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য নিম্ন ও উচ্চপদেও ব্যাংকিং আইন, নীতিমালা ও নির্ধারিত কমিটির সুপারিশ অনুসারেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষে তফসিলি ব্যাংকের নিয়োগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বা এখতিয়ার নেই।
‘অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ও অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ‘অর্থ পাচার’, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ইত্যাদি চাঞ্চল্যকর শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো আদালতের দণ্ডাদেশ, তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। সংবাদমাধ্যম কোনো আদালত নয়, এবং চাঞ্চল্যকর শব্দ কোনো অভিযোগকে বিচারিক সত্যে পরিণত করে না।
প্রতিবেদনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ পাচারের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এস. আলম গ্রুপের প্রতিটি বৈদেশিক লেনদেন এবং ঋণপত্র (LC) দেশের প্রচলিত আইন, বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের AML ডিউ ডিলিজেন্স-প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়েছে। এস. আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ পাচারের অভিযোগ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিতও নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সুস্পষ্ট ব্যাংকিং কমপ্লায়েন্স এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।
এর আগেও বিভিন্ন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল– তার পরিপ্রেক্ষিতে যখন বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে প্রমাণাদি তলব করে, তখন তারা বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থাগুলোর সহায়তা লাভের জন্য বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত তা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। সেই পর্যায়েই এটি প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এই প্রচারণার পেছনে কোনো অসৎ বা দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।
ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের তুলনামূলক নিট মুনাফার যে পার্থক্য বা পরিবর্তনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, তা প্রসঙ্গচ্যুত ও বিভ্রান্তিকর। মুনাফা তুলনার ক্ষেত্রে এককালীন প্রভিশনিং, হিসাবনীতি পরিবর্তন, IFRS সমন্বয়, ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন, জোরপূর্বক ঋণ শ্রেণিবদ্ধকরণ এবং পুনর্গঠিত ব্যালেন্সশিটের প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়ে সরলভাবে তুলনা করা বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্রকে বিকৃত করে। তা ছাড়া যেমনটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি– বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের কতিপয় অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকর্তার সহায়তায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে; তারা চাপের মুখে অধিকাংশ বিনিয়োগ বা ঋণকে নন-পারফর্মিং লোন’ (NPL)-এ পরিণত করেছে, যার ফলে দেশের অন্যতম শক্তিশালী এই ব্যাংকটি এমন শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
এ ধরনের উপস্থাপনা পাঠকের মধ্যে কৃত্রিম নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, যা আর্থিক বিশ্লেষণের ন্যূনতম পদ্ধতিগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত ঘটনাবলি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন কোনো বেআইনি, জোরপূর্বক বা রাষ্ট্রীয় প্রভাবনির্ভর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। বিশেষত ‘ডিজিএফআই কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া’, ‘পদত্যাগে বাধ্য করা’, ‘চাপ প্রয়োগ’, ‘সরাসরি উপস্থিতি’ ইত্যাদি অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক। এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিলভিত্তিক প্রমাণ বা ঘটনাকালীন নথিপত্র, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি।
বরং পুরো বিবরণটি মূলত ‘একাধিক সূত্র’, ‘সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল ব্যক্তি’ কিংবা বহু বছর পর প্রদত্ত ধারা বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। কোনো প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের শ্রুতনির্ভর অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার মৌলিক যাচাই মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন বা পরিচালক পরিবর্তন প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়। যদি বাস্তবিকভাবে কোনো বেআইনি অধিগ্রহণ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে সে বিষয়ে কোনো আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ও নির্ধারিত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না– প্রতিবেদনে তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
ব্যাংক খাতের সংকট ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে এমন ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক সংকটের প্রধান বা একমাত্র কারণ একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী। বাস্তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট, ডলারসংকট, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের অস্থিরতা, আমদানি-চাপ, নীতিগত কঠোরতা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জসহ বহুমাত্রিক কারণসমূহ দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান।
খেলাপি ঋণ, মুনাফা হ্রাস বা তারল্যসংকট– এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে একক কোনো গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপানো বাস্তবতাবর্জিত এবং বিভ্রান্তিকর।
রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ও পূর্বনির্ধারিত আখ্যান
প্রতিবেদনজুড়ে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা’ ইত্যাদি রাজনৈতিক অভিঘাতসম্পন্ন শব্দের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার স্পষ্টভাবে ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর ইঙ্গিত বহন করে। কোনো ব্যক্তি বা শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ছবি থাকা কিংবা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকা বেআইনি সম্পর্কের প্রমাণ নয়।
এস. আলম গ্রুপ ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, ভোগ্যপণ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান খাতে অবদান রেখে আসছে এবং বিগত সব রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই ব্যবসা পরিচালনা করেছে। এসব বাস্তব অবদান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধু নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত করে ধারাবাহিক ন্যারেটিভ তৈরি করা বাস্তবতার বিকৃতি।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে অভিযোগ, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর বয়ান এবং পরবর্তীকালের ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে তথ্যের নির্ভুলতা, যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতার বাধ্যবাধকতাও সমানভাবে প্রযোজ্য।
এস. আলম গ্রুপ সব সময় দেশের আইন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং প্রক্রিয়াগত কমপ্ল্যায়ান্সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এস. আলম গ্রুপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে দেশের ব্যাংকিং খাত-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগের বিচার হবে আদালত, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে– বেনামি সূত্রনির্ভর মিডিয়া বয়ানের মাধ্যমে নয়। সংবাদপত্রের দায়িত্ব হলো বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা; কোনো পক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যানের বাহক হওয়া, পর্দার আড়ালের অযাচাইকৃত বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অভিযোগকে বিচারিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে একই সঙ্গে অভিযোগকারী, বিশ্লেষক, সাক্ষী ও সিদ্ধান্ত প্রদানকারীর ভূমিকা সংবাদমাধ্যম নিজেই গ্রহণ করেছে। অথচ কোনো বিষয়ে তদন্তাধীন তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিযোগ ও অসমর্থিত ধারণাকে একত্রে উপস্থাপন করে সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে কার্যত ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ প্রদান সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে।
আমরা আশা করি, দৈনিক প্রথম আলো এস. আলম গ্রুপ বা এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম-সম্পর্কিত অসত্য, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর অংশসমূহ অবিলম্বে সংশোধন বা প্রত্যাহার করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা নিশ্চিত করবে।
অন্যথায় এস. আলম গ্রুপ তার আইনগত অধিকার সংরক্ষণপূর্বক প্রযোজ্য আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
–এস. আলম গ্রুপ