অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেশের অর্থনীতি ক্রমেই সরকারি পরিচালন ব্যয়ের বৃত্তে আটকে পড়ছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের অনুৎপাদনশীল খাত হিসাবে পরিচিত ‘পরিচালন ব্যয়’ বা চলতি খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আসন্ন বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ এক ধাক্কায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা সরকারের মোট উন্নয়ন ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। বড় অঙ্কের এই ব্যয় মেটাতে রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়ছে উন্নয়ন খাতের পরিধি। ফলে থমকে যাচ্ছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও সরকারি বিনিয়োগের গতি। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য থাকা জরুরি। তারা বলছেন, এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যদিকে, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার, এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রাজস্ব আয় আশানুরূপ না বাড়িয়ে যদি পরিচালন ব্যয় কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের ব্যয় বাড়তে থাকে, তবে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শুধু তাই নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনুৎপাদনশীল খাতের ব্যয় সংকোচন এবং সরকারের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বড় অঙ্কের এই বাজেটের অর্থায়ন কিভাবে হবে এবং অর্থের ব্যবস্থা হলেও সেটি বাস্তবায়নের দক্ষতা সরকারের রয়েছে কিনা সেটাও জরুরি বিষয়। এসব দিক বিবেচনায় রেখে আগামী অর্থবছরের বাজেট হওয়া উচিত। ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই ভাবে চলতি অর্থবছরে পরিচালন খাতে ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সংশোধিত বাজেটে ২৮ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি বাজেটে এডিপিতে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ২ লাখ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ সরকারি পরিচালন ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয় আবার প্রায় একই গতিতে কমছে। যদিও আসন্ন বাজেটে বিএনপি সরকার এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ যুগান্তরকে বলেন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় বা অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দের আকার না বাড়িয়ে ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে সরকারকে কৃচ্ছ সাধন নীতি অনুসরণ করতে হবে।
পরিচালন ব্যয়ের মূল খাতগুলো : আসন্ন বাজেটে যে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে, তা মূলত ব্যয় করা হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা পরিশোধে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির টাকা এই পরিচালন ব্যয় থেকেই পরিশোধ করা হয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, কৃষি (সার, বীজ) এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ও নগদ প্রণোদনা দিতে হয়। সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি খরচ, স্টেশনারি, অফিসের বিদ্যুৎ ও পানির বিল, আপ্যায়ন এবং প্রচার-প্রচারণা বাবদ খরচ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং দুস্থদের মাঝে ভিজিডি-ভিজিএফের চাল বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নগদ অর্থায়ন করা হয়।
উন্নয়ন ব্যয় কী : দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি খরচ করা হয়, তাকে উন্নয়ন ব্যয় বলে। বাংলাদেশে এটি মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি নামে পরিচিত। এতে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন করা হয়। এসব উন্নয়নের ফলে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।