রাজধানীর উত্তরায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করায় ভুক্তভোগীদের আবারও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে স্থানীয় একদল লোক। ফলে ভুক্তভোগী নারী আছিয়া আফসানা সুলতানা (৪০) ও তার পরিবারের লোকজন প্রাণনাশের হুমকিতে রয়েছেন উল্লেখ করে সম্প্রতি উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি করেছেন।
এদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে হামলাকারী এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামী আলফাজ উদ্দিনকে (৫০) পুলিশ অদৃশ্য কারণে গ্রেপ্তার করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। আলফাজের নামে আরো চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ঢাকা উত্তর মহানগরের আলফাজ ৫১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। তিনি ছাড়াও ওই মামলার অন্য আসামিরা হলেন সোলেমান (৪২), আওলাদ (৪৫), সালাম (৩), রাহুল (৩৮), মাসুদ (৩৮), হীরা (৩৮), জুয়েল রাজ (৩৮), আল-আমিন (৩৫) ও সোহাগ খান (৩৭) সহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জন।
জানা যায়, আছিয়া ছাড়াও আতিকুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী মোটা অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখেছে আলফাজ ও তার অনুসারীরা।
তা ছাড়া আছিয়া ও আতিকুরের মতো অনেক ভুক্তভোগী রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ভয়ে মুখ খুলছেন না অনেকেই।
ভুক্তভোগী আছিয়া মামলার এজাহারের উল্লেখ করেন, অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি, চাঁদা দাবি ও হামলার ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। সম্প্রতি তাদের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৭ মে সন্ধ্যায় ১১ নং সেক্টরের জনপদ রোডে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ফার্নিচারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এ সময় ভুক্তভোগীর স্বামী আমিনুল ইসলাম বাপ্পীকে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয় এবং তাকে রক্ষা করতে গেলে গৃহবধূ আছিয়াকেও মারধর করা হয়।
মূল আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মো. আবু সাঈদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ইতিমধ্যে আমরা চারজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তবে এজাহারনামীয় বাকীদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযোগ পাওয়া যায়, অভিযুক্তরা বিএনপির নেতাকর্মীর পরিচয়ের দাপট দেখিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও সাধারণ জিডি চলমান থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে ।
অন্যদিকে আতিকুর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, আলফাজ তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি করলে হত্যার হুমকি দেয়। এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় সম্প্রতি একটি জিডি করেছেন। সেখানে উল্লেখ করেছেন, তিনি রয়েল সাইন লজিস্টিকস (বিডি) লিঃ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। কিন্তু সম্প্রতি আলফাজ উদ্দিনসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন বিবাদী তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বিবাদীদের দাবীকৃত টাকা না দিলে তাকে দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়।
সর্বশেষ গত ৫ মে সকালে আলফাজ কয়েকজনকে নিয়ে তাদের উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ১৪ নং সেক্টরত্ব ১৭ নং রোডের বাসায় ওয়্যারহাউসের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। একই সঙ্গে দাবীকৃত চাঁদার টাকা না দিয়ে যদি ওয়্যারহাউসের তালা খুললে ওয়ার হাউস আগুনে জ্বালিয়ে দেবে। ঘটনার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও ওয়ার হাউজ খুলতে পারেন নি আতিকুর। অন্যদিকেও পুলিশও কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না বলে জানান তিনি। এসব ঘটনায় উত্তরার ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এদিকে পুলিশ বলছে, তারা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু এজাহারনামীয় আসামি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও গ্রেপ্তারের আওতায় আনতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ডিএমপির অবস্থান জানতে চাইলে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ডিএমপির অভিযান চলমান রয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পাশাপাশি যাদের নামে থানায় সুনিদিষ্ঠ অভিযোগ রয়েছে সাঁড়াশি অভিযানে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য কাজ করছে পুলিশ।
এদিকে এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঢাকা ১৮ আসন) এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সচেতনভাবে বলা আছে, যদি কেউ অপরাধ করে সে যে দলের, যে পদেই থাকুক না কেন, তার বিরদ্ধে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিএনপি করে বলে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে এ রকম কিছু যেন না হয়। এই বার্তা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া আছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা সচেতনতার সঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি দলীয় নেতাকর্মী যেন কোনো অপরাধে না জড়ায়, তার পরও দু-একটায় জায়গায় দলের নামে কেউ কোনো অপরাধ করলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।