Image description

যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্প্রতি ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন করে। বোয়িং থেকে উড়োজাহাজগুলো কিনতে খরচ হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)। কিন্তু বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের এত বড় চুক্তির পরও উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়ে হাল ছাড়েনি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস।

প্রতিষ্ঠানটি এবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১০টি এয়ারক্রাফট বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে।

গত এপ্রিলের শেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি প্লেন কেনার চুক্তি করে। যদিও বোয়িংয়ের আগে এয়ারবাস থেকে বিমানের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রস্তাব আমলে না নিয়ে বোয়িং থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-ম্যাক্স। এগুলো কিনতে ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এয়ারবাস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। ১০টি উড়োজাহাজের মধ্যে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ মডেলের ওয়াইড বডি এবং চারটি এ৩২১-নিও মডেলের ন্যারোবডি। এ৩৫০-৯০০ মডেলের উড়োজাহাজে ৩৮টি বিজনেস ক্লাস, ২৮টি প্রিমিয়াম ইকোনমি এবং ২১৪টি ইকোনমিসহ মোট ২৮০টি আসন রয়েছে। এ৩২১-নিও উড়োজাহাজ ২৮টি বিজনেস ক্লাসসহ মোট ২১৫ আসনবিশিষ্ট।

 

সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি এয়ারবাসের একটি প্রতিনিধি দল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় বিমানের এমডি ও সিইও ছাড়াও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে এয়ারবাস তাদেরকে একটি এয়ারলাইন্সে মিক্সড ফ্লিট থাকার উপকারিতা সম্পর্কে ব্রিফ করে। এরপর তারা বিমানের টেকনো-ফিন্যান্স কমিটি বরাবর ১০টি এয়ারক্রাফট বিক্রির প্রস্তাব জানায়।

এর আগে, ২০২৪ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১৪টি এয়ারক্রাফট বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল এয়ারবাস। এয়ারবাসের সেই প্রস্তাবে তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সায় দিয়ে ১০টি এয়ারক্রাফট কেনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর সেই চুক্তি থেকে সরে আসে সরকার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তির ফলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। শুল্ক চুক্তিতে বিমানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত উড়োজাহাজ, এর যন্ত্রাংশ ও সেবা ক্রয় বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এর অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান।

এয়ারবাস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। ১০টি উড়োজাহাজের মধ্যে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ মডেলের ওয়াইড বডি এবং চারটি এ৩২১-নিও মডেলের ন্যারোবডি। এ৩৫০-৯০০ মডেলের উড়োজাহাজে ৩৮টি বিজনেস ক্লাস, ২৮টি প্রিমিয়াম ইকোনমি এবং ২১৪টি ইকোনমিসহ মোট ২৮০টি আসন রয়েছে। এ৩২১-নিও উড়োজাহাজ ২৮টি বিজনেস ক্লাসসহ মোট ২১৫ আসনবিশিষ্ট

তবে, এত বড় চুক্তির পরও হার না মেনে এখনও বিমানের কাছে এয়ারক্রাফট বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে এয়ারবাস।

এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, এয়ারবাসের প্রস্তাবটি তারা পেয়েছেন এবং বর্তমানে তা যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, যেকোনো প্রস্তাবই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক সুবিধা এবং অপারেশনাল প্রয়োজন বিবেচনায় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এখনও কতটি বা কোন মডেলের উড়োজাহাজ প্রস্তাব করা হয়েছে তা নিশ্চিত নয়, তবে সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্স কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

এয়ারবাসের প্রস্তাব এবং বিমানের বহরে মিক্সড ফ্লিট থাকার বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, রুটভেদে কখনও লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় ভিন্ন ধরনের এয়ারক্রাফট ব্যবহার করলে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি বোয়িং ও এয়ারবাস একসঙ্গে পরিচালনায় বড় কোনো জটিলতা নেই, কারণ পাইলট ও ইঞ্জিনিয়ারদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সহজেই দক্ষ করা যায়। ফলে মিক্সড ফ্লিট অনেক ক্ষেত্রেই এয়ারলাইন্সের জন্য বেশি কার্যকর ও সুবিধাজনক।

 

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-ম্যাক্স। এয়ারবাস যেসব মডেলের উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে এগুলোও একই ধরনের।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে মোট ১৯টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার (৮ সিরিজ ও ৯ সিরিজ), চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং পাঁচটি ড্যাশ ৮-৫০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।

এই চুক্তির পরও এয়ারবাসের নতুন প্রস্তাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের বিমান বহর নিয়ে বোয়িং–এয়ারবাস প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি, বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বর্তমান সরকার ২০৩৪–৩৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। তাদের লক্ষ্য, জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা বিমানকে আধুনিকায়ন, বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন ও কার্গো হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।