মাত্র দুই বছর আগে এক ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এই নেতার জন্য বর্তমান পরিস্থিতি এক নাটকীয় বিপর্যয়। গত দুই বছরে অজনপ্রিয় নানা নীতি থেকে বারবার সরে আসা এবং একের পর এক কেলেঙ্কারির মুখে তার নেতৃত্ব এখন বড় ধরনের সংকটে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে সরিয়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তার নিজের দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) মধ্য থেকেই চাপ বাড়ছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না বরং "দেশ পরিচালনার কাজ চালিয়ে যাবেন"।
মাত্র দুই বছর আগে এক ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এই নেতার জন্য বর্তমান পরিস্থিতি এক নাটকীয় বিপর্যয়। গত দুই বছরে অজনপ্রিয় নানা নীতি থেকে বারবার সরে আসা এবং একের পর এক কেলেঙ্কারির মুখে তার নেতৃত্ব এখন বড় ধরনের সংকটে।
যেভাবে সংকটের শুরু
গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনের পর স্টারমারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তীব্র রূপ নেয়। তবে তার নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল। গত বছর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নিজের দলের চাপের মুখে তিনটি বড় নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল স্টারমার সরকার।
চলতি বছরের শুরুর দিকে লর্ড ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। যদিও ম্যান্ডেলসন নিয়োগের আগের সব যাচাই-বাছাই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং সাজাপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল, তবুও স্টারমার তাকে নিয়োগ দেন। এই ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রীর বিচারক্ষমতা নিয়ে দলের ভেতরে সংশয় তৈরি করে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনে। নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়ের পেছনে নাইজেল ফারাজের দল 'রিফর্ম ইউকে' এবং বামপন্থী 'গ্রিন পার্টি'র উত্থানকেও দায়ী করা হচ্ছে।
নির্বাচনী পরাজয়ের পর লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সোমবারের মধ্যে অন্য কেউ এগিয়ে না এলে তিনি নিজেই স্টারমারের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন। পরে ওয়েস্ট তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও বর্তমানে প্রায় ৯০ জন এমপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন অথবা তার বিদায়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে বলেছেন।
ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা যদি মনে করেন তাদের নেতার ওপর আস্থা নেই, তবে তারা অভ্যন্তরীণ অনাস্থা প্রস্তাব বা নেতৃত্বের লড়াইয়ের ডাক দিতে পারেন। টনি ব্লেয়ার, ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন এবং লিজ ট্রাস—বিগত দুই দশকে এই প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই মূলত দলীয় কোন্দল, নির্বাচনী ব্যর্থতা বা কেলেঙ্কারির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিয়ার স্টারমার এখন সেই একই ধারাবাহিকতার মুখে দাঁড়িয়েছেন।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি বা চ্যালেঞ্জার কারা?
অ্যাঞ্জেলা রেনার
ম্যানচেস্টারের দরিদ্রতম এলাকায় বেড়ে ওঠা রেনার লেবার পার্টির বামপন্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি নিজেকে প্রকৃত 'শ্রমজীবী শ্রেণির' প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তবে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের কর ফাঁকির অভিযোগে তদন্তের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ কর কর্তৃপক্ষ তাকে এই অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। ফলে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে প্রধান বাধাটি এখন অপসারিত হয়েছে। তার লড়াকু গল্প ও সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষমতা তাকে নেতৃত্বের দৌড়ে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।
অ্যান্ডি বার্নহাম
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম তার জনপ্রিয়তার কারণে 'কিং অফ দ্য নর্থ' নামে পরিচিত। তিনি এর আগে দুইবার লেবার পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে হেরেছিলেন। মেয়র হিসেবে তিনি ওই অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন এবং মহামারির সময় সাহসী ভূমিকার জন্য প্রশংসিত। তবে প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাকে আগে এমপি হতে হবে। দলের নীতিনির্ধারক কমিটি আগে তাকে বাধা দিলেও এখন একজন বর্তমান এমপি বার্নহামের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। ডাউনিং স্ট্রিট থেকেও তাকে প্রার্থী হতে বাধা না দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বার্নহাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে পুরো ব্রিটেনের মানুষের জন্য রাজনীতিকে সঠিকভাবে কার্যকর করবেন।
ওয়েস স্ট্রিটিং
১৯৮৩ সালে পূর্ব লন্ডনে এক কিশোর দম্পতির ঘরে দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া স্ট্রিটিং গত কয়েকদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নিজের পথ পরিষ্কার করছেন। স্বাস্থ্য সচিব থাকাকালীন তিনি স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। তবে চিকিৎসকদের বেতন নিয়ে অসন্তোষের কারণে তিনি সমালোচনার মুখেও পড়েন। গত বৃহস্পতিবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর থেকে তিনি আস্থা হারিয়েছেন। তার মতে, লেবার পার্টির এখন একটি ভিশন বা লক্ষ্য দরকার, কিন্তু বর্তমানে সেখানে কেবল একটি 'শূন্যতা' বিরাজ করছে। স্ট্রিটিং দলের ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বামপন্থীদের সমর্থন পাওয়া তার জন্য কঠিন হতে পারে।