Image description
ভাসমান জীবনে রোহিঙ্গাদের ৯ বছর । শরণার্থী জীবনের অবসান চায় রোহিঙ্গারা স্বপ্ন দেখিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন ড. ইউনূস প্রত্যাবাসনে বড় সুযোগ নতুন সরকারের।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমনের ৯ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সময় যত বাড়ছে ফেরার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে তাদের। তবুও প্রতিনিয়ত জন্মভিটায় ফেরার স্বপ্ন বুনছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন একে একে ৯টি বছর পার হতে চলেছে, প্রত্যাবাসনের সাফল্য শূন্যই রয়ে গেছে। আর কবে প্রত্যাবাসন হবে? বাস্তবে কি রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন নাকি আরও দীর্ঘ সময় তাদের পরবাসে ভাসমান জীবন পার করতে হবে— এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও বেশি জটিল। নতুন করে এসেছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা।

বিগত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। দ্রুত মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আশায় বুক বাঁধলেও গত আট বছরে দেশে ফিরতে পারেনি তাদের একটি পরিবারও। এরই ফাঁকে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও শেষ মুহূর্তে নানা কারণে ভেস্তে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

সর্বশেষ গত বছরের ১৪ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতরেসের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছিলেন নিজ দেশে ঈদ করবে রোহিঙ্গারা। এর মধ্যে এক ঈদ চলে গেছে, আরেক ঈদ সামনে। ড. ইউনূসের স্বপ্ন দেখানো ঈদ ঠিকই এসেছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরা হয়নি।

আগামীর সময়রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে বড় ভরসা করেছিলেন ইউনূস সরকারের ওপর। কিন্তু তিনি যে আশ্বাস রোহিঙ্গাদের দিয়েছেন তা তিনি রক্ষা করতে পারেননি। শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদেও দেশে ফেরা হয়নি রোহিঙ্গাদের। ইউনূস সরকার আশ্বাস দিয়েও ফেরাতে পারেননি। রোহিঙ্গাদের এখন শেষ ভরসা তারেক রহমানের সরকার।

বর্তমান সরকার প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পারবেন কি না এ নিয়ে ঘোরপাক খাচ্ছে নানা প্রশ্ন। সফলতা আসুক বা ব্যর্থতা, সরকারের স্থানীয় সংসদ সদস্য এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ২০২৭ সালের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরা নিশ্চিত হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বছরের শেষদিকে কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাবিদ ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসও যোগ দেন সম্মেলনে।

সম্মেলন ঘিরে সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা বেশ আশায় ছিলেন প্রত্যাবাসন নিয়ে। আশা ছিল দ্রুতই হবে তাদের দেশে ফেরা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ওই সম্মেলনের পরও হয়নি কোনো অগ্রগতি।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও রাখাইনে নিরাপত্তাহীনতা ও অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কোনো রোহিঙ্গা নাগরিককে স্বদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকার ৩২টি ক্যাম্পে বছরের পর বছর ধরে আশ্রয় নিয়ে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে তীব্র নাভিশ্বাস ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

আগামীর সময়আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. হাবিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন নতুন কিছু নয়; স্বাধীনতার আগে ও পরেও বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে এ দেশে এসেছেন। তবে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর আসা রোহিঙ্গারা এখন অনেকটাই স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। তারা পাহাড় কাটা ও পরিবেশ ধ্বংস করার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি দাবি করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি কিছু পক্ষ ও সংস্থার বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকায় অনেকেই প্রকৃত অর্থে এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন চায় না। নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য হুট করে এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন মন্তব্য করে তিনি যোগ করেন, তবে সরকার, বিরোধী দল, জনগণ এবং রোহিঙ্গাদের পারস্পরিক সহযোগিতায় এই সংকট সমাধান করা সম্ভব।

এদিকে দীর্ঘ আট বছরেও স্বদেশে ফেরার কোনো সফল আলোকরেখা না দেখে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতারা। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা যুবনেতা মো. মুসা মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরোচিত জুলুম ও ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার স্মৃতিচারণ করে মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বারবার দাবি জানিয়েও রাখাইনে ফেরার সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস মেলেনি। তা ছাড়া বর্তমানে রাখাইনের বেশির ভাগ এলাকা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

আগামীর সময়তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরাকান আর্মির কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের চলমান লড়াইয়ের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হবে।

কুতুপালং ক্যাম্পের আরেক রোহিঙ্গা নেতা নুরুল আমিন তুলে ধরেন, আজীবন শরণার্থী হয়ে থাকা তাদের উদ্দেশ্য নয় এবং তারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবেই নিজেদের অধিকার নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে চান। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ফেরার পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংকট নিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। টেকনাফ সরকারি কলেজের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, একটি ভিনদেশে আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের আট বছর কেটে যাওয়া যেমন আমাদের জন্য কাম্য নয়, তেমনি রোহিঙ্গাদের জন্যও সুখকর হতে পারে না।

বিপুল এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সব ধরনের জটিলতা পাশ কাটিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তাদের নিজ জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান স্থানীয় সাধারণ মানুষ।