Image description

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এখন দ্বিগুণ চাপের মুখে। একদিকে বাইরে দেশের পণ্য বিক্রি অর্থাৎ রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে বেশি দামে। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে মিলে পুরো বাণিজ্যিক খাতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। এতে ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে, বাড়ছে দুশ্চিন্তাও।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রপ্তানির গতি ধীর হয়েছে। কয়েক মাস ধরেই প্রত্যাশা মতো আয় আসছে না। গত মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ওই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে যায়। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক, চামড়া, পাট কিংবা হোম টেক্সটাইল কোনোটাই ভালো করতে পারেনি। শুধু মার্চ নয়, পুরো অর্থবছরের চিত্রও তেমন ভালো ছিল না। অর্থবছরের শুরুর দিকে কিছুটা ভালো থাকলেও পরে টানা কয়েক মাস নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এতে বৈদেশিক আয়ের প্রবাহ কমে গেছে।

অন্যদিকে আমদানির খরচ থেমে নেই। বরং বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে আগের চেয়ে বেশি টাকায় পণ্য আনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটাও বড় কারণ। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি আনতেই এখন বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) আমদানি ব্যয় বেড়ে ৪৯ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ রপ্তানি আয় সে তুলনায় কম, প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এখন ১৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের মতো, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং ডলারের সীমিত সরবরাহ-সব মিলিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানিতে নতুন খাত ও বাজার খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে রপ্তানি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না, আবার আমদানি কমানোরও খুব বেশি সুযোগ নেই।

কারণ জ্বালানি, খাদ্যপণ্য কিংবা শিল্পের কাঁচামাল এগুলোর সবই প্রয়োজনীয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমদানি ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে রপ্তানিতে গতি না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহও সীমিত থাকছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে না পারলেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে এবং ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, যেমন অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাধান পেতে হলে রপ্তানিকে শক্তিশালী করতেই হবে। শুধু একটি বা দুটি খাতের ওপর নির্ভর করলে হবে না, নতুন পণ্য ও নতুন বাজার খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির বিকল্প উৎস বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের চাপ বারবার ফিরে আসবে। এদিকে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা বা রেমিট্যান্স ভালো অবস্থায় থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতিও আগের তুলনায় কম রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক খাতেও কিছু ইতিবাচক প্রবাহ দেখা যাচ্ছে।