Image description

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ আমলে নিয়ে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করের বোঝা সহনীয় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে করজাল বিস্তৃত করে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের আওতা বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ঢাকাসহ সারা দেশে থাকা ছোট ছোট ব্যবসায়ীদেরও ন্যূনতম করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে সম্ভব না হলেও একটি পলিসি করে পরের বছরের বাজেট থেকে এটা কীভাবে চালু করা যায় সে পথ খুঁজতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন তিনি। তবে কর্মজীবী, নিম্ন আয় ও সাধারণ মানুষের ওপর যাতে অযাচিত বোঝা না চাপে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বুধ ও বৃহস্পতিবার টানা দুই দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, ইআরডি সচিব, পরিকল্পনা সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বৈঠকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। রাজস্ব খাতের সামগ্রিক চিত্র ও নতুন বছরের পরিকল্পনা কী হতে পারে তার ওপর একটি ধারণাপত্র তুলে ধরেন এনবিআর চেয়ারম্যান। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, ডলারের বাজার, জ্বালানিসংকট, বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনা এসব বিষয়েও তথ্যউপাত্ত তুলে ধরা হয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। এরপর সামগ্রিক বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের একটি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কেউ কোনো কথা বলেননি। বিশাল আকারের বাজেটের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আয় বাড়াতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেও নজর দিচ্ছে। এজন্য ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচলকারী চার্জার রিকশাগুলোকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। তবে এর জন্য সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় কিংবার অসহনীয় হারে করের বোঝা যেন না চাপে সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলেছেন। 

শুধু তাই নয়, রাজস্ব আদায় বাড়াতে মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর আয়কর আরোপ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে টিআইএনধারী সবার জন্য রিটার্ন দাখিল যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সেটাকে কার্যকর করার পরামর্শও দিয়েছন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, এতে উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন এবং ঘাটতি বাড়ার বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। জানা গেছে, এবারের বাজেটের মোট আকার ধরা হতে পারে ৯ লাখ থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আসছে ২০২৬-২৭ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। ফলে বিশাল আকারের যে ঘাটতি থাকবে তা মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর অংশ হিসেবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের বাজেট সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সংস্থা দুটির সঙ্গে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনাও শুরু করেছে ইআরডি এবং অর্থ বিভাগ।

জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো যায় কি না সেটা আরও অধিক পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুদিন ফেরাতে এ খাতকে চাপমুক্ত রাখতে চান প্রধানমন্ত্রী। এজন্য করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তামাকজাত সব পণ্যের বেলায় করহার বাড়াতে বলা হয়েছে। সম্পদের সারচার্জ আরোপের অংশ হিসেবে বিত্তবান ব্যক্তিদের ওপর করের বোঝা বাাড়ানো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে যাদের নিট পরিসম্পদের মূল্যমান ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত সারচার্জ শূন্য। ৪ কোটি টাকা অতিক্রম করলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পরিবেশ সারচার্জের বিধান আছে। আগামী বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে ৪ কোটির বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের ০.৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হতে পারে। ১

০  কোটির বেশি তবে ২০ কোটির কম হলে ১ শতাংশ, ২০ কোটির  বেশি অথচ ৫০ কোটির কম হলে ১.৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির  বেশি হলে ২ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এ সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না। জানা গেছে, আসছে বাজেটে বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার, জিপ, এমনকি বাস-ট্রাক-পিকআপের মতো  মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকেও কর আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কর আদায়ের চেয়ে সড়কে চার্জার অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা বিধানের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কেননা সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে চার্জার রিকশা এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। এজন্য এ খাতকে বৈধতা দিয়ে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। করকাঠামোতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় যেন সহনীয় থাকে এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনকে সহজ করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং অতি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজারে যতটা সম্ভব করছাড় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।