দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে নেওয়া হচ্ছে বহুমাত্রিক উদ্যোগ।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, স্মার্ট স্ক্যানিং এবং ডিজিটাল অ্যাক্সেস কন্ট্রোলের সমন্বয়ে সচিবালয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক নিরাপত্তা বলয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার এই রূপান্তর শুধু আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়Ñ বরং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৯৯টি অত্যাধুনিক এআই সক্ষম ক্যামেরা স্থাপন। এসব ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণ করবে না; বরং সন্দেহজনক আচরণ, অস্বাভাবিক চলাচল কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করতেও সক্ষম হবে। ক্যামেরাগুলো ২৪ ঘণ্টা নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তাও দেবে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারবে। ফলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও বায়োমেট্রিকে বদলে যাবে প্রবেশ ব্যবস্থা
সচিবালয়ের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতেই আনা হচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। দর্শনার্থীদের জন্য চালু করা হচ্ছে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণ, বায়োমেট্রিক অ্যাক্টিভেশন এবং কিউআর কোড সংবলিত অস্থায়ী পাস ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যবস্থার ফলে কে কখন সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন, কতক্ষণ অবস্থান করছেন এবং কোন দপ্তরে যাচ্ছেনÑ এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। টাইমবেজড এন্ট্রি ও এক্সিট সুবিধা থাকায় নির্দিষ্ট সময়সীমার বাইরে কোনো দর্শনার্থী অবস্থান করলে সেটিও নজরদারির আওতায় আসবে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন বলেন, “বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা হুমকি কেবল শারীরিক নয়, প্রযুক্তিনির্ভরও। তাই প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন ঘটানো, পরিচয় যাচাই, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং বায়োমেট্রিক নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে অননুমোদিত প্রবেশ অনেকাংশে কমে আসবে।”
তিনি বলেন, “কিউআর কোড ও বায়োমেট্রিকভিত্তিক অস্থায়ী পাস ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ সহজ হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজন হলে দ্রুত তথ্য যাচাই করতে পারবে।”
যুক্ত থাকবে স্মার্ট স্ক্যানার
সচিবালয়ের চারটি প্রধান প্রবেশ গেটে স্থাপন করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন আধুনিক ব্যাগেজ স্ক্যানার ও আর্চওয়ে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব যন্ত্রের মাধ্যমে প্রবেশকারী ব্যক্তি ও বহনকৃত সামগ্রী দ্রুত ও নির্ভুলভাবে স্ক্যান করা সম্ভব হবে। এতে বিস্ফোরক, অস্ত্র কিংবা সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করার সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বাড়বে। নতুন এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর চাপও কমবে।
থাকবে আধুনিক ওয়্যারলেস যোগাযোগ
সচিবালয়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নতুন আধুনিক ওয়্যারলেস সেটও সংযোজন করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান এবং দ্রুত সমন্বয়ের জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিজিটাল ওয়্যারলেস ব্যবস্থার মাধ্যমে একই সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অগ্নিকাণ্ড, অনুপ্রবেশ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বয় ঘটাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আরডিএফ প্রযুক্তিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
সচিবালয়ের যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও যুক্ত হচ্ছে রেডিও তরঙ্গভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি (আরডিএফ)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত যানবাহনে রেডিও তরঙ্গভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি স্টিকার সংযুক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ দূরত্বে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিভিত্তিক শনাক্তকারী পাঠযন্ত্রের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে। ফলে প্রতিটি গাড়ি আলাদাভাবে থামিয়ে যাচাইয়ের প্রয়োজন কমে আসবে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রবেশপথে যানজট কমবে এবং নিরাপত্তা যাচাই আরও দ্রুত করা যাবে। অনুমোদনহীন কোনো যানবাহন প্রবেশের চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি শনাক্ত করা যাবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আরডিএফ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে যানবাহন প্রবেশের ওপর আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
ভেহিক্যাল স্ক্যানারে বাড়বে নিরাপত্তা
সচিবালয়ের যানবাহন প্রবেশপথে অত্যাধুনিক ভেহিক্যাল স্ক্যানার স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রবেশকারী যানবাহন এবং বহন করা ব্যক্তি ও সামগ্রী দ্রুত নির্ভুলভাবে স্ক্যান করা সম্ভব হবে। সন্দেহজনক বস্তু বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম সক্রিয় হবে। সংশ্লিষ্ট যানবাহনের প্রবেশ তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বর্তমান সময়ে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা। ভেহিক্যাল স্ক্যানার ও এআইভিত্তিক নজরদারি একসঙ্গে কাজ করলে প্রতিরোধক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।”
তিনি বলেন, “শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না; সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে এসব দিকেও নজর দিতে হবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট সিকিউরিটি কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় আরও নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।