চাহিদার বিপরীতে দেশে গ্যাসের জোগান সংকট শুরু হয় মূলত ২০১৬ সালের দিকে। স্থানীয় গ্যাসের এ সরবরাহ সংকট মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়।
যার প্রতিফলন দেখা যায় পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ এবং গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭-এ। বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের এসব মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা তৈরি করা হয়। গত সাত বছরে ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এ সময় গ্যাস খাতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এভাবে আমদানিনির্ভরতার ফাঁদে পড়ে দেশের গ্যাস খাত। ফলে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যায়নি, উপেক্ষিত থাকে অনুসন্ধান। ফলে সে সময়ের সরকারের করা গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা দেশের জন্য এক রকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা ছিল ঋণ ও আমদানিনির্ভর। এ মহাপরিকল্পনায় দেশের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে গ্যাস খাতের সংকট যেমন কাটানো যায়নি, তেমনি সাশ্রয়ী গ্যাসের দাম পর্যায়ক্রমে বাড়িয়েও এ খাতকে ঋণগ্রস্ত করে তোলা হয়েছে। বর্তমানে গ্যাস সংকট সামাল দিতে পেট্রোবাংলা দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিচ্ছে, সেই সঙ্গে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যবহৃত জনগণের অর্থ (গ্যাস উন্নয়ন তহবিল) খরচ করে ফেলেছে। গ্যাসের এ আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কতটা গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে তা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিষ্কার হয়েছে।
গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (এলএনজির হিসাবে যা দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন টন)। ২০১৮ সালে গ্যাসের মোট চাহিদার ১৭ ভাগ এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হবে, যা ২০২৩ সালে দাঁড়াবে ৪০ ভাগ, ২০২৮ সালে দাঁড়াবে ৫০ ভাগ এবং ২০৪১ সালে দাঁড়াবে ৭০ ভাগ। অর্থাৎ ধাপে ধাপে দেশের গ্যাস খাতকে আমদানিনির্ভর করার রূপরেখা ছিল সেই মাস্টারপ্ল্যানে।
দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাসের চাহিদার ২৯ শতাংশ পূরণ করা হয়েছে এলএনজি আমদানি করে। এ পরিমাণ এলএনজি আমদানিতে গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
দেশে স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ সংকট মেটাতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি কেনা হয়েছিল ১১ হাজার ৮১২ কোটি টাকার। গত সাত বছরের ব্যবধানে এলএনজি আমদানি ব্যয় পাঁচ গুণেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্যাসের সরবরাহ সংকট মেটাতে স্থানীয় গ্যাস খাতে খুব বেশি বিনিয়োগ করেনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। বরং স্থানীয় গ্যাস খাত অনুসন্ধান, উত্তোলনবিমুখ রেখে বছরের পর বছর এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী-আমলা ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একটি চক্র এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধাভোগী হয়েছে।
উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় আরো কেন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হলো? ২০১৭ সালে গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনায় কেন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরবরাহ জোগান দিতে আমদানির বিষয়টিতে জোর দেয়া হলো? মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামো বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু গ্যাসের জোগান বাড়ানো যায়নি। আর এসব করতে গিয়ে বাংলাদেশ ফাঁদে পড়েছে। পেট্রোবাংলা বিভিন্ন তহবিলের অর্থ খরচ করছে, ঋণ নিচ্ছে, তাহলে এ মহাপরিকল্পনা আমাদের কী উপকারে এসেছে?’
আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধান সীমিত করে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় দুই দশক ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। যতটুকু নেয়া হয়েছে তাতে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় খুব বেশি উন্নতি হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। বরং পর্যায়ক্রমে গ্যাসের সরবরাহ কমে দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বিপরীতে বাড়ানো হয়েছে এলএনজি আমদানি।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়নি দেশী-বিদেশী গোষ্ঠী। ফলে একদিকে আমদানিনির্ভর, বিদেশী ঋণনির্ভর এবং প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। যার ফলে সক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা দাঁড়ায়নি। যে কারণে ৩০ বছর ধরে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের শতভাগ মালিকানা রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তেল-গ্যাস, কয়লা—এগুলো পুরোপুরি রফতানি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন এবং তৃতীয়ত, এগুলো রক্ষার মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ প্রয়োজন। অর্থাৎ দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি করা। সরকার যদি যথাযথ পদক্ষেপ নিত তাহলে গ্যাস ও কয়লা আমদানি করার প্রয়োজন হতো না।’
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর এলএনজি আমদানি হচ্ছে ৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টন। অথচ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানির শুরুর বছরে তা ছিল দুই মিলিয়ন টনের কিছু বেশি। এ পর্যন্ত মোট ৩৬ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজির চারটি চুক্তি ও স্বল্পমেয়াদি দুটি চুক্তির মাধ্যমে দেশে এখন পর্যন্ত ৫৮৮টি কার্গো আমদানি করা হয়েছে (এ হিসাব মার্চ ২০২৬ সাল পর্যন্ত)।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ সংকট মেটাতে অতীতের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে গিয়ে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে গেছে। গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ওই সব পরিকল্পনায় স্থানীয় বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু কতটুকু আমরা করেছি? বিনিয়োগের পরিমাণ কত—তা খতিয়ে দেখলে হয়তো দেখা যাবে খুবই যৎসামান্য বিনিয়োগ হয়েছে।’
গ্যাস খাতে আমদানিনির্ভরতার পেছনে বিগত সময়ের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের গ্যাস খাতে সরবরাহ সংকট এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পেছনে বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। সংশ্লিষ্টরা এসব পরিকল্পনা থেকে সুবিধা লুটে নিয়েছে। আর তার খেসারত দিতে হয়েছে দেশের জ্বালানি খাতকে, এ দেশের জনগণকে।’
দেশের স্থানীয় গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালে ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। যার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সময়সীমা শেষ হলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে যেমন জোরালো তৎপরতা ছিল না, তেমনি সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানবিমুখতার জন্য আমদানিনির্ভরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এখন পেট্রোবাংলা স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জোরালো তৎপরতার কথা জানাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও মজুদ বাড়াতে দুটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, ৫০টি কূপ খনন কার্যক্রম। দ্বিতীয়ত, ২০২৮ সালের মধ্যে আরো ১০০ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার। এ দুটি উদ্যোগের মাধ্যমেই বোঝা যায় পেট্রোবাংলা গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা থেকে সরে আসতে চায়। চলতি অর্থবছরে কার্গো আমদানির লক্ষ্যমাত্রায় স্পট থেকে কেনার পরিকল্পনাও কমানো হয়েছে। স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে বরং আমদানি কমানোর পরিকল্পনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া এখন চাইলেও গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই, কারণ সেই অবকাঠামো আমাদের নেই।’