একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই অফিস। আবার সেখানেই থাকার ব্যবস্থা। এর পরও জনে জনে তো লাগবেই, সমন্বিত ব্যবহারের জন্যও লাগবে গাড়ি। আর তাই ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে কেনা হয়েছে ৪০টি গাড়ি। যেখানে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। অথচ কোয়ার্টার থেকে কারখানায় যাতায়াতের জন্য অনায়াসে ব্যবহার করা যেত শাটল সার্ভিস। যার জন্য গাড়িও কিনতে হতো কম, খরচও কমে যেত।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তারা বলছে, সব গাড়িই সাধারণ ঠিকাদারের মাধ্যমে বিডার্স ফাইন্যান্সিং বা চড়া সুদে নেওয়া ঋণের অর্থ থেকে কেনা হয়েছে।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় অবস্থিত এ কারখানার মোট আয়তন ১১০ একর। যেখানে কারখানার পাশাপাশি রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসনের ব্যবস্থাও। কারখানা থেকে কোয়ার্টারের দূরত্বও খুব বেশি নয়। ফলে এত গাড়ি কেনার প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।
জানা গেল, ১০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা এসব গাড়ির মধ্যে ছয়টি জিপ ব্যবহার করছেন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, বোর্ডের পরিচালনা পরিষদের তিন সদস্যসহ দেশি-বিদেশি পরামর্শকরা।
এ ছাড়া বিভাগীয় প্রধানরা ব্যবহার করছেন আটটি কার, প্রকল্পের কাজের প্রয়োজনে কার রাখা আছে দুটি।
এ ছাড়া চতুর্থ থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা দুটি, ষষ্ঠ থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তারা তিনটি, স্টাফরা তিনটি, জ্বালানি কন্ট্রোল রুমে কর্মরতরা একটি এবং প্রকল্প কর্মকর্তারা একটিসহ মোট ১০টি মাইক্রোবাস পেয়েছেন।
আরও কেনা হয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্বে চলাচলের জন্য একটি, মেইনটেন্যান্স টিমের জন্য একটি, জরুরি প্রয়োজনের জন্য একটি এবং প্রকল্পের নির্মাণকাজ পরিদর্শনের জন্য একটিসহ মোট চারটি পিকআপ ভ্যান।
বিভিন্ন শিফট পরিচালনায় তিনটি মিনি বাস, কারখানার বাইরে মালপত্র বহনের কাজে দুটি ট্রাক এবং সিকিউরিটি প্যাট্রলিং ও প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য তিনটিসহ মোট পাঁচটি মোটরসাইকেলও কেনা হয়েছে।
আইএমইডি গাড়ি কেনা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সে বিষয়ে কথা হয় প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা বলছেন, প্রকল্পের কাজের স্বার্থেই গাড়িগুলো কেনা হয়েছে। যেহেতু বিডার্স ফাইন্যান্সের অর্থ কারখানা থেকেই পরিশোধ করা হবে, সে ক্ষেত্রে প্রকল্প শেষে গাড়িগুলো টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইক্যুইপমেন্টের (টিওঅ্যান্ডই) আওতাভুক্ত করে কারখানার আওতায় রেখে দেওয়া হবে। অর্থাৎ পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে না।
অবশ্য এটিই প্রথম নয়, প্রকল্পের নামে অর্থ অপচয় অনেক আগে থেকেই চলে আসছে বলে মন্তব্য করলেন আইএমইডির সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিশেষ করে এক শ্রেণির কর্মকর্তার মধ্যে গাড়ির প্রতি ভীষণ আকর্ষণ। দেখা যায়, কোনো প্রকল্প শুরু হলে সবার আগে গাড়ি কেনায় ঝোঁক দেন তারা। এগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
আইএমইডির প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদনের প্রাথমিক খসড়াটি আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। সেখানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। কিন্তু তা না হওয়ায় পরে দুদফায় বাড়ানো হয় মেয়াদ। বর্তমানে এটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের জুনে। এখন নতুন করে আরও দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নেই সময় যাবে ১১ বছর। অর্থাৎ প্রকল্পের অগ্রগতি যাই হোক না কেন, গাড়ি কেনায় ঠিকই বাস্তবায়ন হয়েছে।
এবার প্রকল্প ব্যয়ের দিকে নজর দিয়ে দেখা যাক সেখানে কী অবস্থা। এটি বাস্তবায়নে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীর সময় ৪৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত জুন পর্যন্ত শতভাগ অর্থ খরচের লক্ষ্য থাকলেও গত মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৮৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ। আইএমইডি বলেছে, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭২ মাস বা ১৬০ শতাংশ এবং সে হিসাবে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
দেশে ইউরিয়া সারের বর্তমান চাহিদা ২৮-৩০ লাখ টন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ২০ লাখ টন সার আমদানি কমিয়ে সারের ঘাটতি পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আন্দোলন, বাধাবিপত্তি, অতিবৃষ্টি, হাউজিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়কে বিকল্প স্থানে পুনর্বাসনে দেরি হওয়াসহ নানা কারণে আরও দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইএমইডির খসড়া প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের নিয়মনীতি না মেনে, অর্থাৎ সেফটি নেট, সেফটি সুজ, বেল্ট, গামবুট, হেলমেট ইত্যাদি ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োজিত শ্রমিকরা নির্মাণকাজ করছেন, যা সমীচীন নয়।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, কমার্শিয়াল ভবন ও ফায়ার ভবনসহ কারখানা সম্পর্কিত সংযুক্ত ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এসব ভবনে প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ উৎপাদনও চলছে। এই ভবনগুলোর নির্মাণকাজের গুণগত মানও ভালো।
নির্মাণাধীন এ-টাইপ, সি-টাইপ, ডি-টাইপ, ই-টাইপ এবং এফ-টাইপ কোয়ার্টারের কাজ প্রায় শেষ দিকে। পঞ্চম তলার ছাদ ঢালাইসহ ইটের গাঁথুনি শেষ হয়েছে এবং টাইলস, কিচেন কেবিনেট, প্লাস্টারসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে।
পরিদর্শনের সময় প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছে আইএমইডি। তারা বলেছেন, ৬০০ ও ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটগুলো একটি পরিবারের জন্য থাকার উপযোগী নয়। বিশেষ করে ফ্ল্যাটগুলোর ব্যালকনি অনেক ছোট। বিষয়গুলো স্থানীয় কর্মশালায় জানানো হয়েছে বলেও জানালেন তারা।
প্রকল্পের আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২৭টি পাঁচতলা ভবন তৈরির জন্য অনেক বেশি সরকারি জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে। আইএমইডি বলছে, এক্ষেত্রে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে অনেক সরকারি জায়গা সাশ্রয় হতো। বেঁচে যাওয়া জায়গায় ভবিষ্যতে নতুন প্লান্ট বা কারখানা সম্প্রসারণ করা যেত।
পরিদর্শনে হাউজিং ভবনের দেয়ালে ব্যবহৃত ইটের মধ্যে বেশ কিছু স্থানে খারাপ ইটের ব্যবহার দেখা গেছে, যেগুলো আধুনিক ভবনে ব্যবহারের অনুপযোগী। যদিও ঠিকাদারদের দাবি, এসব ইট জলছাদে দেওয়া হয়েছে, আদতে দেয়ালে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। দেয়ালে ইটের গাঁথুনিও মসৃণ হয়নি। প্রকল্পের অবশিষ্ট নির্মাণকাজে যেন এ ধরনের ইট ব্যবহার না করা হয়, সেদিকে নজর দিতে পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।
এ ছাড়া হাউজিং এলাকায় নির্মিত স্কুলের রেলিং ঠিকমতো বা পর্যাপ্ত উচ্চতায় না দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।