একটি রুমের প্রতিটি সারিতে ১৪টি করে চৌকি-এমন ৪টি সারিতে ৫৬টি চৌকিতে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। এক চৌকিতে একেক শিফটে ঘুমান একেকজন। একটির সঙ্গে আরেকটি চৌকি লাগোয়া। চলাফেরাও কষ্টকর। রুমে আলো-বাতাস ঢোকার পরিবেশ নেই। যে কক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন থাকা যায়, সেখানে থাকছেন শতাধিক পুলিশ সদস্য।
মানবেতর জীবনযাপনের এমন দৃশ্য দেখা যায় রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের কয়েকটি ভবনের ব্যারাক ঘুরে। পাকা ভবনের ব্যারাকে আবার সবার থাকার সুযোগও হচ্ছে না। অনেকে থাকছেন খোলা স্থানে তাঁবুর ব্যারাকে। ওখানের পরিবেশ আরও করুণ। নেই বাথরুম কিংবা টয়লেট। দিনে তীব্র গরমে তাঁবুর বাইরে থাকেন বেশির ভাগ সদস্য। যারা নাইট ডিউটি করেন, বাধ্য হয়ে গরমের মধ্যে ঘুমান তারা। পুলিশ সদস্যদের থাকার এসব ব্যারাক দেখলে যে কারও মনে হবে কোনো জেলখানায় বন্দি কয়েদির বাস। ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা ডিউটি করে ব্যারাকে ফিরে স্বস্তিতে ঘুমাতেও পারেন না অনেকে। কারও কারও আবার স্থায়ী কোনো চৌকি নেই। তারা যখন যে চৌকি খালি পান, সেখানে ঘুমান। পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ শুধু থাকারই না, খাবারের মানও নিম্নমানের। ফলে ঠিকমতো খেতেও পারেন না অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে হতাশায় ভুগছেন পুলিশ সদস্যরা। ঢাকার বাইরে পোস্টিং নিতে চেষ্টা করছেন অনেকে। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ঘুরে দেখা যায় পাকা ভবন ও তাঁবু মিলিয়ে অন্তত ১১টি ব্যারাক। সেখানে থাকছেন কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগের সদস্যরা। পুকুরপাড়ের তাঁবুর ব্যারাকে গিয়ে দেখা যায় একটি চৌকির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া। পুরো ব্যারাকটিতে খোলা নেই কোনো জানালা। তীব্র গরমের মধ্যেই ঘুমাচ্ছেন কয়েকজন সদস্য। প্রথম দেখায় যে কেউ ভাববেন, জেলখানার কয়েদিদের রাখা হয়েছে সেখানে।
তাঁবুর ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি বড় সিলিং ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের গরম বাতাসে সেখানে বেশি সময় থাকা কষ্টকর। এ সময় উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের নানা সংকটের কথা। শুধু এই তাঁবুই নয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে এমন চারটি তাঁবুর ব্যারক রয়েছে। সবকটির একই চিত্র। তাঁবুতে থাকা পুলিশ সদস্যরা হতাশায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের আবাসিক সংকট থাকলেও ফোর্সদের বিশেষ করে ব্যারাকে থাকা সদস্যদের সমস্যা বেশি। এ বিষয়টি সমাধানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটা পরিকল্পনা করা উচিত। কেননা ফোর্সদের সুস্থ রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে কয় ঘণ্টা সময় পান, ওই কয় ঘণ্টা যদি পরিপূর্ণ বিশ্রাম না পান তবে তারা অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
রাজারবাগে ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা জানান, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে পুলিশের ফোর্সদের ডিউটি বাড়ে। ৮ ঘণ্টা ডিউটি থাকলেও অনেক সময় ১৪-১৫ ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে ব্যারাকে ফিরে তারা শান্তিতে বিশ্রামও নিতে পারেন না। ফলে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
তাঁবুর ব্যারাকের সামনে বসা এক কনস্টেবল জানান, তিনি ৬ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছেন। চার মাস আগে ঢাকায় এসেছেন। পাকা ভবনের ব্যারাকে জায়গা না পেয়ে তাঁবুর ব্যারাকে থাকছেন। প্রচণ্ড গরমের জন্য তিনি ঘুমাতে না পেরে বাইরে গাছের নিচে বসেছেন। তাঁবুর ভেতরে ফ্যানগুলোর গরম বাতাসে থাকা কষ্টকর। এছাড়া টানা বৃষ্টি হলে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁবুতে থাকা বেশির ভাগ পুলিশ সদস্য পাশের পুকুরে গোসল করেন। একেক সময় একেক ভবনের টয়লেট ব্যবহার করেন।
ডিএমপি সদর দপ্তরে দায়িত্বরত এক কনস্টেবল যুগান্তরকে জানান, এক বছর ব্যারাকে আছেন। আজ এক বিছানায় তো কাল আরেক বিছানায় ঘুমান। এখনো একটি নির্ধারিত বেড পাননি। তিনি বলেন, আমার মতো অনেকে আছেন, যারা ১০ দিন এক বেডে তো ১৫ দিন আরেক বেডে ঘুমান।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে কনস্টেবল থেকে ইনস্পেকটর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার সদস্য থাকেন। পুলিশের যত ইউনিট রয়েছে, সবকটির ফোর্স রাজারবাগে থাকে। এর মধ্যে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগের সদস্যই অর্ধেক। তাদের বাসস্থান অপ্রতুল। ডিউটির চাপও বেশি। এ বিষয়ে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স বিভাগ) মো. আসলাম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমি ফোর্সদের সমস্যা স্যারদের জানিয়েছি। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমি ব্যারাকগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। দেখেছি খুবই ভয়াবহ অবস্থা। যেখানে থাকার কথা ৩০ জন, সেখানে আছেন ৯০ জন। এক গ্রুপ যখন ডিউটিতে যায়, আরেক গ্রুপ তখন ঘুমায়। দুই গ্রুপ একসঙ্গে এলে ঘুমানোর জায়গা দিতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের ফোর্সের জন্য আরও বেশকিছু ব্যারাক খুব জরুরি। ঢাকা মহানগর পুলিশ নতুন ব্যারাক নির্মাণের জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।