Image description

আকাশে জিলহজ মাসের বাঁকা চাঁদ দেখার অপেক্ষা। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা দরজায় কড়া নাড়ছে। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে এখন সাজ সাজ রব। তবে এবারের কোরবানির বাজারে প্রথাগত হাটের চেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে আধুনিক পশুখামার বা অ্যাগ্রো ফার্মগুলো।

একদিকে পশুর পর্যাপ্ত জোগান নিয়ে খামারিদের মুখে হাসির ঝিলিক, অন্যদিকে কোরবানির পরবর্তী সময়ে পশুর চামড়া সংগ্রহ ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয় আড়তদাররা।

পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রামে এবার পশুর চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সূক্ষ্ম এক ব্যবধান থাকলেও খামারিরা বেশ আত্মবিশ্বাসী। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন কোরবানির ঈদে চট্টগ্রামে পশুর মোট চাহিদা ধরা হয়েছে আট লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর বিপরীতে জেলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে সাত লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু।

কাগজে-কলমে প্রায় ৩৫ হাজার পশুর ঘাটতি থাকলেও উত্তরবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে আসা গরু দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উৎপাদিত পশুর মধ্যে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ গরু এবং পৌনে পাঁচ লাখ মহিষ। চট্টগ্রামে মহিষের কোরবানির চিরাচরিত রেওয়াজ থাকায় খামারিরা এবার উন্নত জাতের মহিষ পালনেও বিশেষ জোর দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ক্রেতাদের  আচরণে।

 চট্টগ্রামের বিত্তবান শ্রেণির ক্রেতারা এখন কাদা-মাটি, ভিড় আর দালালের দৌরাত্ম্য এড়াতে হাটের পরিবর্তে সরাসরি খামারেই সেরে নিচ্ছেন কোরবানির পশু কেনা।

নগরীর পতেঙ্গা এলাকার এক অ্যাগ্রো ফার্মে গরু দেখতে আসা ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ বলেন, হাটে এখন অনেক ঝক্কি। খামারে এসে সরাসরি পশুর লালন-পালন দেখে তৃপ্তি পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোরবানির আগ পর্যন্ত পশুটি খামারেই রাখা যায়। খামারিরা জানিয়েছেন, শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান ও মিরকাদিমের মতো উন্নত জাতের একেকটি গরুর দাম পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে।

পশু কেনাবেচায় উৎসবের আমেজ থাকলেও ভিন্ন চিত্র কাঁচা চামড়ার আড়তগুলোতে। আসন্ন ঈদে চট্টগ্রাম মহানগরী ও ১৫ উপজেলায় চার লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন স্থানীয় আড়তদাররা। তবে গত বছরের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, গত বছর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের চাহিদার তুলনায় সংগৃহীত চামড়ার পরিমাণে ব্যাপক ব্যবধান ছিল। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর কোরবানির পশুর সংখ্যা যা-ই বলুক না কেন, আড়তদারদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে সেই পরিমাণ চামড়া বাজারে আসে না। গত বছর তারা চার লাখ ১৫ হাজার ৩৫১ পিস চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এবারও লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে চার লাখের আশপাশে।

চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রধান সংকট এখন পুঁজি এবং ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর অতিনির্ভরশীলতা। সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামের ১১২ জন সদস্যের মধ্যে অনেকেই লোকসানের মুখে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের প্রতিবছর ধারদেনা করে চামড়া কিনতে হয়। বছরের পর বছর দাবি জানানো সত্ত্বেও আমরা কোনো ব্যাংক ঋণের সুবিধা পাইনি।

ব্যবসায়ীদের বড় অভিযোগ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দাম নিয়ে। তাদের দাবি, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও ঢাকার ট্যানারি মালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে চান না। চট্টগ্রামে রিফ লেদার ছাড়া আর কোনো ট্যানারি না থাকায় তাঁরা এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বাকিতে চামড়া নিয়ে টাকা পরিশোধ করতে দীর্ঘসূত্রতা করেন, যা ক্ষুদ্র আড়তদারদের পথে বসার উপক্রম করেছে। সব প্রতিকূলতার মাঝেও চট্টগ্রামের কোরবানির বাজারে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। অনেক খামারি অনলাইন বুকিংহোম ডেলিভারি সেবা চালু করেছেন। প্রবাসীরা বিদেশে বসে ভিডিও কলে পশু পছন্দ করছেন এবং পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে দাম পরিশোধ করছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, জেলায় বর্তমানে ১১ হাজারের বেশি স্থায়ী খামার রয়েছে। ক্ষতিকর হরমোন বা স্টেরয়েডমুক্ত পশু নিশ্চিত করতে প্রতিটি খামারে নজরদারি চালানো হচ্ছে।