Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দলীয় কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ড তেমন না থাকায় নেতাকর্মীরাও ঝিমিয়ে পড়েছেন। অনেকের মধ্যে হতাশার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে না পাওয়ার আফসোস। এসব গুরুতর বিষয় উপলব্ধি করে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও নেতিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে দলের পুণর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি।

এরই অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরুর চিন্তা-ভাবনা করছে দলটির হাইকমান্ড। সংসদীয় দায়িত্ব ও সরকারি পদের কারণে শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ও কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি এখন সরকারে আছে। জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো এক এক করে দেওয়া হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরাই স্থান পাবেন।

 

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ এই দুই ইউনিটে নতুন নেতৃত্ব আনতে নীতিনির্ধারকরা এখন মাঠের ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়নের দিকে ঝুঁকছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগত তদারকির মাধ্যমে নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিগত দিনের আন্দোলনে ভূমিকার বিষয়টি যাচাই করছেন।

জানা গেছে, এবার কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হতে পারে। অর্থাৎ যারা বর্তমানে সরকারে আছেন বা দলীয় সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাদের মহানগরের নেতৃত্বে না রাখার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। একই সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদেরও নতুন কমিটিতে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে দলটির ভেতরে।

মাঠের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তৈরি হবে। চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন এবং তা বাস্তবায়ন করলে কর্মীরা আনন্দিত হবে— কাজী আবুল বাশার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি

সূত্র বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই দলের সাংগঠনিক শক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার এই দুই ইউনিটে নবীন ও প্রবীণ নেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি ঘোষণার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় কাজে তাদের প্রবল ব্যস্ততার কারণে মহানগরের সাংগঠনিক কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা ও শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিয়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

দক্ষিণ বিএনপিতে আলোচনায় যারা
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটা রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। আর ঢাকার রাজনীতি মহানগর দক্ষিণের উপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা, সরকারের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র সচিবালয়, বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলসহ নানা কারণে মহানগর দক্ষিণ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুত্বের বিবেচনায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দায়িত্ব অর্পিত হতে পারে দলটির পরীক্ষিত নেতা হাবিব উন খান সোহেলের উপর। সোহেল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। বিএনপির প্রধান সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। অন্যতম অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। তিনি মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক আহ্বায়কও।

 

বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে হাবিব উন নবী খান সোহেলের অনেক কর্মী বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন। সেক্ষেত্রে সোহেল ছিলেন বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত। মনোনয়ন না পেলেও অন্যদের মতো তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কর্মকাণ্ড করেননি। চুপচাপ দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে— এসব বিবেচনায় নিয়ে দলের হাইকমান্ড হাবিব উন নবী সোহেলকে পরবর্তিতে উপযুক্ত কোনো মূল্যায়ণ করবে। যার প্রথম পদক্ষেপ হবে দলের মহানগরের শীর্ষ পদে আসীন করা, যাতে মহানগর দক্ষিণের প্রতিটি কর্মীর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়।

ব্যবসা বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। দলের সুসময়েও অন্যায় কাজে জড়িত হইনি। আশা করি দল মূল্যায়ন করবে— মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সম্ভাব্য কমিটির শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায় আছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দীর্ঘদিনের কমিশনার , বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ হারুন (কমিশনার হারুন),  যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু। এর বাইরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিএনপি দলীয় সাবেক প্রার্থী এবং বর্তমান কমিটির সদস্য হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার নামও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

তানভীর আহমেদ রবিন ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করলেও বিজয়ী হতে পারেননি। যদিও তিনি অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তার পরাজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিকার চেয়ে তিনি আইনি পদক্ষেপও নিয়েছেন। সে কারণে তার প্রতি দলের ‘সিম্পেথি’ কাজ করতে পারে এমন গুঞ্জন আছে। বর্তমান কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই তরুণ নেতা সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

কাজী আবুল বাশার দীর্ঘ ১৮ বছর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র ছিলেন। রাজপথের আন্দোলনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পুরান ঢাকায় রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। অন্যদিকে, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে।

তৃণমূলের কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। তাই নতুন কমিটি যখনই হবে সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কর্মীবান্ধব, ক্লিন ইমেজের নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে সেটাই প্রত্যাশা— সাইদুর রহমান মিন্টু, দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি

বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে সক্রিয় আ ন ম সাইফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক বা গুরুত্বপূর্ণ পদের দৌড়ে রয়েছেন। এছাড়া রাজপথের সক্রিয় নেতা হিসেবে ফরহাদ হোসেনও সাধারণ সম্পাদক পদের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী। এছাড়াও সাইদুর রহমান মিন্টু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং দলের দুর্দিনে মহানগরের দফতরের দায়িত্ব পালন করেছেন।

উত্তর বিএনপিতে আলোচনায় যারা
উত্তর বিএনপিতে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় আলোচনায় আছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতা মামুন হাসান, সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, কফিল উদ্দিন আহমেদ, ফয়েজ আহমেদ ফরু। বর্তমান সদস্য সচিব মোস্তফা জামান ও শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নামও বিভিন্ন সূত্রে সম্ভাব্য তালিকায় উঠে এসেছে। বিগত দিনের আন্দোলনগুলোতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা হাইকমান্ডের নজর কেড়েছে। ফলে শীর্ষ পদে তাদের মধ্যে থেকেও বেছে নেওয়া হতে পারে। সাবেক যুবদল নেতা মামুন হাসান মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় মহানগর কমিটিতে ভালো অবস্থানে থাকতে পারেন বলে আলোচনা হচ্ছে।

অন্যদিকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ও যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম আব্দুর রাজ্জাকেরও শীর্ষ পদে আসার আলোচনা আছে। এদের মধ্যে সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক ১৯৮৮ সাল থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং ২০১৮ সাল থেকে মহানগরের প্রতিটি কমিটিতে দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে অন্য নেতাকর্মীদের মতো নির্যাতিত হয়েছেন। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পরাজিত এম এ কাইয়ুমও ফের মহানগর উত্তরের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে গুঞ্জন চলছে।

 

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিগত প্রায় দেড় যুগ ফ্যাসিবাদী হাসিনা শাসনামলে যারা মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়েও মাঠ ছাড়েননি, তাদের মূল্যায়ন করে একটি শক্তিশালী মহানগর কমিটি গঠন করাই এখন বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এখন অনেকেই বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। এদের অনেকে শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ারও চেষ্টা করছেন। নতুন কমিটিতে কখনো কখনো এসব লোকজনও গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেয়। তাই রাজনীতির মাঠে ‘হাইব্রিড’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নেতাদের ভিড়ে যেন ত্যাগীরা হারিয়ে না যায় সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

নির্যাতনের মুখেও মাঠে ছিলাম। তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আছি। ফলে দায়িত্ব দেওয়া হলে আস্থার প্রতিদান দিতে পারব সেই আত্মবিশ্বাস আছে— আব্দুর রাজ্জাক, দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি

এদিকে কমিটি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে কাজী আবুল বাশার বলেন, মাঠের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তৈরি হবে। চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন এবং তা বাস্তবায়ন করলে কর্মীরা আনন্দিত হবে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বলেন, বিগত সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকার চেষ্টা করেছি, ব্যবসা বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। দলের সুসময়েও অন্যায় কাজে জড়িত হইনি। আশা করি দল মূল্যায়ন করবে।

নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার আলোচনায় থাকা মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু বলেন, তৃণমূলের কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। তাই নতুন কমিটি যখনই হবে সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কর্মীবান্ধব, ক্লিন ইমেজের নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে সেটাই প্রত্যাশা।

ঢাকা উত্তরের দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নির্যাতনের মুখেও মাঠে ছিলাম। তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আছি। ফলে দায়িত্ব দেওয়া হলে আস্থার প্রতিদান দিতে পারব সেই আত্মবিশ্বাস আছে।