Image description

রাজধানীর কলাবাগান এলাকার গৃহিণী নিগার সাবিহা (ছদ্মনাম)। অবসরে ফেসুবক স্ক্রল করছিলেন। নজরে এলো একটি লোভনীয় বিজ্ঞাপন—ঘরে বসে টাকা আয়ের সুযোগ। বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাষায় যেটা ‘অনলাইনে পার্টটাইম জব’। কৌতূহল থেকে সাবিহা যোগাযোগ করলেন। জানতে পারলেন—বিনিয়োগের মাধ্যমে কয়েকটি ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করলে আসবে বিপুল অঙ্কের টাকা।

 

লোভ সমলাতে পারলেন না সাবিহা। শুরু করেন বিনিয়োগ ও ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করা। ১৩ মার্চ থেকে শুরু; ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেন দুই লাখ আট হাজার ৮৬০ টাকা। ২৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই টাকা বিনিয়োগ করেন। শেষ দিকে বিনিয়োগের বিপরীতে তাকে লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছিল। কোনো টাস্কও সম্পন্ন করতে বলা হচ্ছিল না। বিজ্ঞাপনদাতারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেন। উপায় না পেয়ে সাবিহা দ্বারস্থ পুলিশের। অভিযোগ দেন কলাবাগান থানায়। রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

 

রাজধানী টু মেহেরপুর নেটওয়ার্ক

 

তদন্তে উঠে আসে, বিজ্ঞাপনদাতাদের নেটওয়ার্ক ঢাকা থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু তারা কারা, কেন এই লোভনীয় বিজ্ঞাপন এবং উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল বিজ্ঞাপনদাতারা জানেন। তাদেরকে কবজায় নিতে অভিযান শুরু করে ডিবি। ঢাকা থেকে প্রথমে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) ধরা পড়েন দুইজন। তারা হলেন—সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন। তাদের দেওয়া তথ্যে একই দিন ঢাকা থেকে আরও পাঁচজনকে ধরা হয়। তারা হলেন—হৃদয় হাসান, মোহাম্মদ রাকিব, মো. রাশেদ, এমআই খাইরুল ও সাদিত হোসেন।

 

জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা ডিবিকে আরও কয়েকজনের কথা জানান, যারা থাকেন মেহেরপুর। ডিবির একটি দল গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। স্থানীয় সূত্র ধরে পরদিন শুক্রবার (৮ মে) খুঁজে বের করা হয় ওই সাতজনের তিন সহযোগীকে। তারা হলেন—মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের রোহান আলী ওরফে রাকেশ, ফয়সাল আহমেদ ও সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের মো. রনি মিয়া।

 

এই তিনজনকে ধরার পর উন্মোচন মূল রহস্য। তারা ডিবির কাছে স্বীকার করেন—খণ্ডকালীন চাকরির (পার্টটাইম জব) বিজ্ঞাপন হলো তাদের প্রতারণার হাতিয়ার। তারা সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে এই প্রতারণা করে আসছিলেন। তারা মূলত ফেসবুকে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচার করেন।

 

আগ্রহীদের টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করে ‘অনলাইন টাস্ক’ সম্পন্নের নামে ধাপে ধাপে টাকা বিনিয়োগে বাধ্য করেন। শুরুতে টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া তাদের প্রতারণার কৌশল।

 

ডিবি জানায়, গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে রোহান ওরফে রাকেশের বাড়ি থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা নগদ ১৭ হাজার ৪৪০ টাকা ও তিনটি গ্রামীণফোনের সিম জব্দ করা হয়।

 

এ বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) জামিনুর রহমান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডিবির একটি টিম তাদের তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে মেহেরপুরে অভিযান পরিচালনা করেছিল। অভিযানে মেহেরপুর জেলা পুলিশের ডিবি সদস্যরা তাদের সহযোগিতা করেছে।

 

সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে দম্পতি

 

ডিবি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ধরা পড়া সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। মিরপুর ডিওএইচএস থেকে আটক হওয়া এই দম্পতির গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপির চাঁদবিল এলাকায়। ঢাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

 

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে একই কৌশলে প্রতারণা করে আসছিল। চক্রটির বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উইং জানায়, তিন ধাপে গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের কাছ থেকে প্রতারণা চক্রের আরও সদস্য, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এজন্য গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত প্রত্যেকের এক দিন করে মোট তিন দিনের রিমান্ড দেন।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির (ঢাকা দক্ষিণ) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনলাইনে পার্টটাইম চাকরি, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভ দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত রিমান্ড দেন। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।