রাষ্ট্রকল্পে সাংস্কৃতিক ভাবনা রাজনৈতিক ভাবনার সমান অথবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়:
১। রাষ্ট্রকল্প বলতে বোঝায়:
এগুলো ছাড়া কোনো দল সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারে না। কারণ সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ হলো রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের গল্প।
বিএনপি, এনসিপি, এবং জামাত—কারোই স্টেট ভিশন নাই কিংবা সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভও নাই।
২। যাদের রাষ্ট্রকল্প নেই, তারা সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ ধার করে
এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পরিচিত নিয়ম। কারণ তাদের কাছে:
তাই তারা বাধ্য হয় বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ কপি করতে।
বাংলাদেশে সেই ন্যারেটিভ তৈরি করেছে একমাত্র আওয়ামী লীগ/বামেরা। ফলে BNP/NCP-এর রবীন্দ্রনাথ উদযাপন করা কোনো “ভালোবাসা” না— এটা ideological dependency
৩। রাষ্ট্রকল্পহীন দলগুলো ক্ষমতা-নির্ভর, সমাজ-নির্ভর নয়
যে দল রাষ্ট্রকল্পহীন, তারা তিনটি জিনিসে বিশ্বাস করে:
এদের কাছে রাষ্ট্র মানে:
রাষ্ট্রের মানে যে কালচার প্রজেক্ট —এটা তাদের অভিধানে নেই। ফলে তারা সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারে না, কারণ:
বিএনপি, এনসিপি, এবং জামাত—এই তিনটির কোনোটাই নেই।
______________________________
কারণ তাদের একটা দর্শন আছে, রাষ্ট্রকল্প আছে—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা আসলে সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদের বেঙ্গল ভার্সন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের:
এগুলো মিলেই তারা একটি cultural hegemony তৈরি করেছে।
__________________
১। ইকো-সিস্টেম:
রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে যে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়েছে তার সাথে জরিত বিলিয়ন-ডলারের অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। এই ইকোসিস্টেমে আছে:
রবীন্দ্রনাথ এখানে একটি ব্র্যান্ড—যার চারপাশে অর্থ, ক্ষমতা, মর্যাদা, চাকরি, গবেষণা, ফান্ডিং—সবকিছু ঘোরে।
এটা “রবীন্দ্রনাথকে ভালো লাগে” টাইপ ব্যাপার না এটা state-sponsored cultural capitalism
২। কেন আওয়ামী লীগ এই কমপ্লেক্সকে এত গুরুত্ব দেয়?
কারণ আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রকল্প= বাঙালি জাতীয়তাবাদ + রবীন্দ্রনাথীয় নান্দনিকতা— এই কমপ্লেক্স ছাড়া টিকতে পারে না।
তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ:
রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রকল্প অর্ধেক ভেঙে পড়ে। তাই তারা রঠাকে শুধু উদযাপন করে না—তারা তাকে institutionalize করেছে।
৩। এই কমপ্লেক্স কীভাবে কাজ করে —
রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কমপ্লেক্সের তিনটি স্তর আছে:
ক. রাষ্ট্রীয় বল:
এরা রবীন্দ্রনাথকে “রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড” বানায়।
খ.কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ:
এরা রঠাকে “পণ্য” বানায়।
গ. ইন্টালেকচুয়াল ক্লাস
এরা রঠাকে “বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা” দেয়।
এই তিনটি স্তর মিলে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠে: রাষ্ট্রীয় নান্দনিকতার কেন্দ্রীয় আইকন।
এটা কোনো কবিকে ভালোবাসার ব্যাপার না— এটা hegemony production।
__________________
কারণ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স তৈরি করতে লাগে:
বিএনপি/জামাত—কোনোটাই এগুলোর কোনোটা তৈরি করেনি।
তাদের কাছে রাষ্ট্র মানে পুলিশ, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র।
সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়। ফলে তারা বাধ্য হয় আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ কপি করতে।
রবীন্দ্রনাথ উদযাপন—এটা তারই লক্ষণ।
________________
এই কমপ্লেক্স তিনটি কাজ করে:
১. আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থায়ী করে: সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ বদলানো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বদলানোর চেয়ে অনেক কঠিন। মুজিবের পতন হলেও রবীন্দ্রনাথের হয়নি।
২. বিকল্প সাংস্কৃতিক প্রকল্পকে দমিয়ে রাখে
৩. বাঙালি পরিচয়কে একমাত্র বৈধ পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এতে অন্যান্য পরিচয়— পূর্ব বাঙলা, মুসলিম বাঙলা, আঞ্চলিক বাঙলা— সবকিছুই “অবৈধ” বা “নিম্নমানের” হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক–অর্থনৈতিক কমপ্লেক্স হলো আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রকল্পের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো; আর যেহেতু বিএনপি/জামাতের কোনো রাষ্ট্রকল্প নেই, তারা এই কমপ্লেক্সের derivative সংস্করণ ছাড়া কিছুই হতে পারে না।