দেশে হামের টিকার ঘাটতি ছিল না; বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, পর্যাপ্ত টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও তা সময়মতো ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়নি।
শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল্টন হলে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
গোলটেবিল বৈঠকে টিকা বিশেষজ্ঞ ও আইসিডিডিআর,বির সাবেক গবেষক ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি বলেন, টিকার সংকটের কথা সামনে আসার পর সরকার নতুন চালান সংগ্রহ করে। এর প্রথম চালান হিসেবে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দেশে ২২ লাখ ডোজ হাম টিকা আসে। পরে গত ৫ মে দ্বিতীয় চালানও পৌঁছায়। কিন্তু এসব টিকা কেন্দ্রীয় গুদামে সংরক্ষিত থাকলেও সেগুলো জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়নি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, মাঠপর্যায়ে টিকা না থাকলেও কেন্দ্রীয় গুদামে পর্যাপ্ত টিকা ছিল। কিন্তু পরিবহনের জন্য অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মহাখালী থেকে টিকা পরিবহন কার্যক্রম থমকে যায়। এমনকি উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পৌঁছে দেওয়া কর্মীদেরও নিয়মিত ভাতা দেওয়া হয়নি। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক সমাধান দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাপ্লাই চেইনে কর্মরতদের চাকরি অনিশ্চিত হওয়ায় তারা একাধিকবার আন্দোলনে নেমেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় মানুষকে রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে জানান, বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৫ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মাত্র ৫৬ শতাংশ শিশু বুকের দুধ পাচ্ছে। গর্ভাবস্থায় মা আক্রান্ত হলে নবজাতকের জটিলতা ও অপরিণত জন্মের ঝুঁকিও বাড়ে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ড. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় এখনও প্রায় ১৯ শতাংশ শিশুকে আনা যাচ্ছে না। সময়মতো টিকাদান ও পুষ্টি নিশ্চিত করা ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বুকের দুধ পান ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেক তথ্য এখনও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয় না এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ব্যবহার ছাড়াই পড়ে আছে জনবলের সংকটের কারণে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের টিকাদান ক্যাম্পেইনে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ায় বর্তমানে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, হামের বিস্তার, শিশু মৃত্যু এবং অব্যবস্থাপনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন কবে প্রকাশ হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি তিনি।
স্কুল বন্ধের কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, আপাতত এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেই। বরং সিটি করপোরেশনের নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ২০২১ সাল থেকেই হামের ঝুঁকি বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করে আসলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীত ইজাজ। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। এছাড়া মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে ‘হামের বর্তমান পরিস্থিতি: ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম।