ভোররাত ৪টা। তখনো চারদিকের অন্ধকার কাটেনি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনের সড়কে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। রিকশায় বসা শিল্পী বেগম (৪০)।
এ ঘটনা শুধু শিল্পী বেগমের একার নয়। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোয় এমন অনেক সশস্ত্র
ছিনতাইয়ের ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন নগরীর বাসিন্দারা। ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাত আর সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনায় বর্তমানে প্রায় প্রতিদিন আতঙ্কে ভুগছেন রাজধানীর সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু সশস্ত্র ছিনতাই নয়, চুরি-ডাকাতির সঙ্গে রাজধানীতে হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক। গত চার মাসে রাজধানীতে ৭৮ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।
রাজধানীতে এত ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পুলিশি কার্যক্রম দিয়ে এসব অপরাধ রোধ করা যাবে না। এর থেকে মুক্তি পেতে রাজনীতিবিদ, সমাজের সাধারণ মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। যেসব ছিনতাইকারী মাদকের সঙ্গে জড়িত, তাদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে সুস্থ করে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
আগারগাঁওয়ের ঘটনায় গুরুতর জখম শিল্পী বেগম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর স্বামী ব্যবসায়ী আবদুল হক কালের কণ্ঠকে জানান এক বিষাদময় কাহিনি। গত ১ মে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে স্ট্রোক করা মাকে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে। মায়ের জীবন বাঁচাতে টাকার জন্য স্ত্রী শিল্পী বেগমকে ফোন করেছিলেন। সেই টাকা নিয়ে ইব্রাহিমপুরের বাসা থেকে আসার পথে স্ত্রী ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতের শিকার হন। আবদুল হকের অভিযোগ আরো গুরুতর। গতকাল শুক্রবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত বড় ঘটনার পর আমি যখন শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করতে গেলাম, পুলিশ মামলা নিতে চাইল না। তারা বলল, ছিনতাইকারীদের নাম দিতে না পারলে মামলা হবে না। শেষমেশ শুধু একটি অভিযোগ নিয়ে আমাকে বিদায় করে দেওয়া হয়।’
থানা পুলিশের এ ধরনের শীতল আচরণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা শঙ্কা আরো বাড়ছে। ছিনতাইয়ের অভিযোগটি তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলানগর থানার এসআই জাহিদ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা তদন্ত করছেন, কিন্তু কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাননি। ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারলে মামলা করা হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যদি সিসিটিভি না থাকে বা পুলিশ যদি নাম ছাড়া মামলা নিতে গড়িমসি করে, তবে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
আগারগাঁওয়ের মতো রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, আদাবরসহ নানা এলাকায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
গত ১ মে রাতে মালিবাগ রেলগেটের ইবনে সিনা হাসপাতালের সামনে তিন পোশাক শ্রমিক করিমন, নবী ও রিফাতকে সুইচ গিয়ার (চাকু) দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ছিনতাইকারীরা। শ্রমিক দিবসে ঘুরতে বেরিয়ে তাঁরা এমন নৃশংস হামলার শিকার হবেন কল্পনাও করেননি। শাহবাগ এলাকায় গত ৩০ এপ্রিল ভোরে জামাল উদ্দিন ও সামছুন্নাহার নামের এক প্রবীণ দম্পতিকে কুপিয়ে তাঁদের কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। কদিন আগে যাত্রাবাড়ীর কাজলায় জ্যামে আটকে পড়া গাড়িচালককে ছুরিকাঘাত করতেও দ্বিধা করেনি ছিনতাইকারীরা।
ছিনতাইয়ের পাশাপাশি বাড়ছে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনাও। গত ৭ মে রাতে মহাখালীর পুরনো কাঁচাবাজারের সামনে মোটরসাইকেলে আসা পাঁচ-ছয়জন সন্ত্রাসী কোনো কারণ ছাড়াই এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে রফিকুল ইসলাম নামের এক আউটসোর্সিং কর্মচারী গুরুতর আহত হন। অন্যদিকে একই দিন কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ কলোনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে আহত হন লাকড়ি ব্যবসায়ী রনি এবং এক কিশোরসহ চারজন। এসব ঘটনার কোনো কোনোটির ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ছে সমাজমাধ্যমে। গোলাগুলির এসব ভিডিও দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
ডিএমপি পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে অন্তত এক হাজার ১০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার পরও পরিস্থিতির উন্নতি কেন হচ্ছে না, জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়ার পর ছিনতাইকারীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে এবং আবারও একই পেশায় জড়ায়। এদের বেশির ভাগ মাদকাসক্ত। ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আমরা চেষ্টা করছি। পুলিশের টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে।’
তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া যায় গতকাল শুক্রবার আদাবর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর গ্যাং ‘রক্ত চোষা জনি গ্রুপ’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ‘পাংখা রুবেল’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর। রুবেল আদাবর থানার দুটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত মোট ৯টি মামলা রয়েছে। এর আগেও তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও সে ছিনতাইয়ে নেমেছে বলে জানান আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আদাবর থানায় নতুন ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছি। আমরা ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। মাঠে হয় ওরা থাকবে, না হয় আমরা থাকব। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
সূত্র জানায়, তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয় রাজধানীতে। তাদের একটি গ্রুপ পেশাদার ছিনতাইকারী, যারা প্রাইভেট কার বা অটোরিকশা নিয়ে নির্দিষ্ট স্পটে ওৎ পেতে থাকে। মাদকাসক্ত কিশোররা মাদকের টাকা জোগাতে পথচারীদের ব্যাগ বা ফোন ছিনিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিশোর গ্যাং ও শৌখিন অপরাধীদের অনেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন, যাঁরা মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ান এবং ‘অ্যাডভেঞ্চার’ হিসেবে ছিনতাই করেন।
ডিএমপির অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রাজধানীতে ১০১টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয় ২৫টি। মার্চ মাসেও একইসংখ্যক মামলা হয়। আর ফেব্রুয়ারি মাসে মামলা হয় ২২টি এবং জানুয়ারিতে ২৯টি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ হয়রানির ভয়ে থানায় যান না। অনেকে পুলিশের ‘মামলা না নেওয়ার প্রবণতা’র কারণে কেবল জিডি করে ফিরে আসেন। ফলে প্রকৃত অপরাধের চিত্র নথিবদ্ধ তথ্যের চেয়ে বেশি। রাজধানীর ফুটপাতগুলোয় এখন সাধারণ মানুষ বা অফিসগামী পথচারীরা মোবাইল হাতে নিয়ে হাঁটতে ভয় পান। সন্ধ্যার পর বাসে বা রিকশায় যাতায়াতের সময় জানালা দিয়ে ছোঁ মারা বা ধারালো অস্ত্র ঠেকানো সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভোরে যাঁরা ট্রেন বা বাসে করে ঢাকায় ফেরেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীতে সম্প্রতি ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতিই নয়, নাগরিক নিরাপত্তাবোধের সংকেতও বহন করে। বিশেষ করে ভোরবেলায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত ছিনতাই সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বেকারত্ব, মাদকসংযোগ, অপরাধচক্রের বিস্তার এবং দুর্বল নজরদারি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা বা নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার, সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধ ও নাগরিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে।’