Image description

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, সড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণে আনা, লেক পরিষ্কার ও সুবজায়ন, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা শৃঙ্খলায় আনা। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো সরকারের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে সরকার কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অন্যান্য সমস্যার সমাধানে কাজ করবে।

নগর পরিকল্পনায় সম্পৃক্তরা জানান, ঢাকার সমস্যা সমাধানে সরকারের দৃষ্টি ইতিবাচক। তবে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিকল্পিত ও টেকসই হচ্ছে না। বিগত সরকারের সময়ের মতো জোড়াতালির কাজ হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে ঢাকার সমস্যার সমাধান চাইলে সরকারকে আরও গোছালো কাজ করতে হবে। তারা বলেন, কাগজ কলম নিয়ে বসলে সমস্যার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হবে। এসবের মাঝে বসবাস কোটি মানুষের। প্রতিনিয়ত শহর বড় হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থাসহ বহুবিধ প্রয়োজনে মানুষ ঢাকায় আসছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামাঞ্চল থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ ঢাকায় এসে ফুটপাতে হকারি করছে। সরকারকে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানে মনোযোগী হতে হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে বছরে শত শত কোটি টাকা খরচ হলেও কোনো সমাধান মিলছে না। সরকারকে এসবের কারণ খুঁজে বের করতে হবে- জানান তারা। সমস্যার সমাধানের নামে ঢাকায় নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বরং তা আরও বাড়ছে। জলাশয়, কৃষিজমি, পতিত জমি ভরাট করে গড়ে উঠছে অট্টালিকা।

নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, ঢাকার বিরাজমান সমস্যার সমাধান ঢাকায় নেই। এর সমাধান খুঁজতে হবে ঢাকার বাইরে। গ্রাম-গঞ্জ, জেলা-উপজেলায় নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষকে ঢাকাবিমুখ করতে হবে। উন্নয়নকে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে এসব সমস্যার সমাধান মিলবে। বহু বছর ধরে এসব আলোচনা হলেও এর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বসবাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পেশাজীবীদের ভূমিকাও দরকার। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে নগর পরিকল্পনাবিদদের। পাশাপাশি সর্বাত্মক সহযোগিতা দরকার স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই মাসে রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে মানুষের চলাচলের উপযোগী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিচালনা করা হয় অভিযান। কিন্তু আবার সেসব জায়গায় হকার বসেছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ নানা তৎপরতা চালালেও ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করা যায়নি। এর মধ্যে নতুন নীতিমালা করে হকারদের আইডি কার্ড দেওয়া শুরু করেছে।

জানা যায়, গুলশান এবং ধানমন্ডি লেক পরিষ্কারে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করছে দুই সিটি করপোরেশন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই দুই লেকের পাড়ে পরিকল্পিত উপায়ে অনেক বৃক্ষরোপণ করা হবে। মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। কীভাবে এডিসবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসের লাগাম নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সে বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, যানজট নিরসনে পুলিশকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নগরীর যানজট কীভাবে নিরসন করা যায়, সে বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যানজট নিরসনে ভবনের পার্কিংয়ের জায়গায় গাড়ি পার্কিং নিশ্চিতে কাজ শুরু করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে গাড়ি পার্কিং নিশ্চিত করতে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

অন্যদিকে, বিশৃঙ্খল ব্যাটারিচালিত রিকশার লাগাম টানার কাজ এখনো পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটা বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সমাধানে দুই সিটি করপোরেশন, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা দফায় দফায় সভা করছেন। শিগগিরই ব্যাটারিচালিত রিকশা শৃঙ্খলায় আনার কাজ বাস্তবায়নে দুই সিটি ও ঢাকা মহানগর পুলিশ একযোগে কাজ শুরু করবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইডিপি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, এখন রাজনৈতিক সরকার। কিছু উদ্যোগ তো নেবেই। তবে সেই উদ্যোগগুলো পরিকল্পিত উপায়ে টেকসই সমাধানের জন্য নিতে হবে। এটা না হলে এসব উদ্যোগ থেকে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না। হকার উচ্ছেদ নিয়ে সরকার ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত বদল করেছে। এসব থেকে বোঝা যায়, সরকার খুব ব্রেক ওয়ার্ক করে মাঠে নামেনি। ফুটপাত ও সড়কে হকারদের বসানো কোনো সমাধান নয়। এসবের ভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। কর্মসংস্থান বা দরিদ্রতা নিরসনের জন্য ফুটপাত বা সড়ক নীতিমালা করে হকারদের বসতে দেওয়া কখনো ইতিবাচক হবে না। তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরকারকে ভিন্নভাবে ম্যানেজ করতে হবে। তিনি জানান, নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকার সমস্যা সমাধানে সরকার দৃষ্টি দিয়েছে তা ইতিবাচক। কিন্তু সামগ্রিক কার্যক্রমের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ থাকতে হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার সমস্যাগুলোর মধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, সড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণে আনা, লেক পরিষ্কার ও সুবজায়ন, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা শৃঙ্খলিত করাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারই আলোকে এখন সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য নগর সংস্থা কাজ করছে। পরবর্তীতে অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও কাজ করা হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার সমস্যাগুলো সমাধানে নিরলসভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মশা, ফুটপাত দখলমুক্ত, লেক পরিষ্কারসহ অন্যান্য নাগরিক সমস্যা লাগবে ডিএসসিসি বিশেষ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকাকে বাসযোগ্য করার কাজের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়েছে। সরকারের নির্দেশনার আলোকে ভবনের গাড়ি পার্কিংয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে কাজ করছে রাজউক। এ লক্ষ্যে সমগ্র নগরজুড়ে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করছে রাজউক।