ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ নাস্তানাবুদ করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও। এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। যার পরের মাসেই বেড়েছে মূল্যস্ফীতির চাপও। এর ফলে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন খাতভেদে ভর্তুকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই ভর্তুকি ছাড়িয়ে যেতে পারে ৪২ হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধ চলার সময় যে কয়েক দিন হরমুজ প্রণালি বন্ধ ছিল সে কদিনেই বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি গুনতে হয়েছে। যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অর্থ বিভাগের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ভর্তুকি আমাদের মতো দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য অনিবার্য চাহিদা। এই ভর্তুকির অর্থের সঠিক ব্যবহার করাটাও চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মতো অনেক বিষয়ও জড়িত থাকে।’ এবারের প্রেক্ষাপটে বাজেটে ভর্তুকি কমিয়ে আনা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি। অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে একটি বৈঠকেও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকের একটি কার্যপত্রে বলা হয়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির এই পরিমাণ আগামী অর্থবছরে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ১৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এর সম্ভাব্য আকার বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। যা চলতি বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসেই (এপ্রিল ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬) জয়েন্ট ভেঞ্চার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (বিসিপিসিএল, বিআইএফপিসিএল, আরএনপিএল), বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে ১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। যা অর্থবছরের শেষে নতুন সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। চাপ বাড়ছে সামষ্টিক অর্থনীতিতেও।
এই ভর্তুকি সচল না রাখলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে। গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা বাড়ায় জেলার পাশাপাশি বিভাগীয় শহরেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। এজন্য পুরো বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়াতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও ভর্তুকি কমাতে অব্যাহতভাবে চাপ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ-সংক্রান্ত শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হওয়ায় চলমান ঋণের কিস্তি ছাড়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অবশ্য সরকার প্রত্যাশা করছে জুনের মধ্যে প্রতিশ্রুত কিস্তির অর্থ পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তিতে সুকৌশলে এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার এবং জ্বালানি দক্ষতার শর্তগুলো অত্যন্ত একপেশে। বিদ্যুৎ খাতের এই ‘বিষফোড়া’ পুরো অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার তিন মাস মেয়াদি ভর্তুকি অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এখনই বড় বড় জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং আদানির মতো চুক্তিগুলো সংশোধন না করলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৪২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির বোঝা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ধসিয়ে দিতে পারে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত হয়েছে। সূত্র জানায়, আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে ১ লাখ ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বেশি। ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। অন্যদিকে খাদ্যে ভর্তুকি চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রণোদনায়। এ খাতে প্রণোদনা বাবদ ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হতে পাারে। বর্তমানে বৈধ পথে (ব্যাংকিং চ্যানেলে) রেমিট্যান্স পাঠালে ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬-২৭ বাজেটে এই প্রণোদনার হার ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।