Image description

ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রিপ্টোকারেন্সি বহুল পরিচিত একটি ব্যবসা। বাংলায় ক্রিপ্টোকারেন্সির অর্থ হচ্ছে ‘গুপ্ত টাকা’। যে টাকা দেখা যায় না। ডিজিটাল দুনিয়ায় লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এটিকে। এই ব্যবসার আমেরিকাভিত্তিক একটি কোম্পানির নাম হচ্ছে এফএসপ্রো এআই। যেটি খুব জনপ্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশের একটি সিন্ডিকেট ওই কোম্পানির নামে গোপন অ্যাপস ব্যবহার করে বাংলাদেশের শত শত গ্রাহকের শতকোটি টাকা লুটে নিয়েছে। এখন বন্ধ করে দিয়েছে অ্যাপসও। প্রতারণার শিকার হওয়া সিলেটের এক ভুক্তভোগী সম্প্রতি এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগের তদন্ত করছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। অভিযোগকারী নগরের টিলাগড়ের গোপালটিলার বাসিন্দা সুজিত কুমার দে। অভিযোগে তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকান কোম্পানি এফএসপ্রো-এআই’র নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশের চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার উত্তর বগুলা গ্রামের শাহ আলম, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের বাসিন্দা সম্রাট হোসেন ও গোলাপগঞ্জের খাটকাই গ্রামের বাসিন্দা সোহান টিপু একটি সিন্ডিকেট গড়েন। তারাও নিজেদের ওই কোম্পানির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের কর্মকর্তা দাবি করে টেলিগ্রাম গ্রুপে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেন লোভনীয় অফারও।

এফএসপ্রো-এআই অ্যাপসের মাধ্যমে তারা টাকা বিনিয়োগের আহ্বান জানায়। প্রথমে তারা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে এক সেন্ট করে টোকেন বা কয়েন কেনার প্রস্তাব দেয়। প্রায় দুই বছর আগে এ ধরনের লোভনীয় প্রস্তাবে পড়ে সিলেটের সুজিত সহ দেশের শত শত গ্রাহক ডলার দিয়ে কয়েন কিনেন। সুজিত একাই কিনেন ৫ লাখ কয়েন। পরবর্তীতে কোম্পানির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রধান দাবি করে শাহ আলম প্রস্তাব করেন, যেসব গ্রাহক কোম্পানিতে এক হাজার ডলার এককালীন বিনিয়োগ করবেন তারা পরবর্তী সময়ে আজীবন এর লভ্যাংশ পাবেন। তার প্রস্তাবেও সাড়া দেন কয়েকশ’ গ্রাহক।

সিলেটের সুজিতসহ তার পরিবারের সদস্যরা একাই ওই কোম্পানিতে ৪ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেন। এই টাকা বিনিয়োগের পর প্রতি মাসে এপকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। যে টাকা তুলতে আন্তর্জাতিক মানি চেঞ্জার বিনান্স এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিকাশ কিংবা নগদ ব্যবহার করা হতো। সুজিত জানান, প্রথম মাস ২৫ হাজার টাকা পেলেও পরবর্তী মাসগুলোতে ওই টাকা কমে আসে। এভাবে কমতে কমতে এক সময় টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। যে টাকা আজীবন দেয়ার কথা সেটি কয়েক মাস দিয়ে বন্ধ করে দেয়ায় শত শত গ্রাহক প্রতারণার শিকার হন। অন্যদিকে, ক্রয় করা এফএসপিসি কয়েন নিয়েও তাদের মধ্যে সন্দেহ হয়। কারণ ওই কয়েন তারা ক্রয় করলেও বিক্রি করার প্ল্যাটফরম ছিল না।

প্রতারক চক্র ওই সময় কয়েন বিক্রয় করতে বিটক্যাশ নামের একটি এক্সচেঞ্জ চালু করার প্রস্তাব দিয়ে কয়েন ক্রয়কারী গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আরও ২০০ ডলার নেয়। সুজিত জানান, ২০০ ডলার নেয়ার পর শাহ আলম ও তার চক্র ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। একপর্যায়ে তারা চালু করা এফএসপ্রো-এআই অ্যাপসও বন্ধ করে দেয়। এতে করে গ্রাহকরা পড়েছেন বিপাকে। বিনিয়োগকৃত টাকা পাওয়ার কোনো সূত্রই তারা পাচ্ছেন না। এ নিয়ে শুধু তিনিই নন, এরইমধ্যে গ্রাহকরা ঐক্যবদ্ধ হওয়া শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে প্রতারণার শিকার হওয়া গ্রাহকরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এফএসপ্রো-এআই ভিকটিম গ্রুপ নামে একটি গ্রুপ খুলেছেন। সেখানে প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা নিজেদের লোকসানের কথা তুলে ধরছেন। ঢাকার বিক্রমপুরের শেখ সেলিম ও মালয়েশিয়া ফেরত প্রবাসী আবু হানিফ, সিলেটের রিপনসহ শতাধিক গ্রাহক জানিয়েছেন, শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীরাও এতে বিনিয়োগ করেছেন। এখন পেমেন্ট বন্ধ থাকায় বিনিয়োগ নিয়ে সবাই শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। যাদের প্রস্তাবে তারা এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন তারাও গা ঢাকা দিয়েছেন

এদিকে, সিলেটের সুজিতের অভিযোগটি জেলা প্রশাসন থেকে মেট্রো পুলিশে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তদন্ত করছেন দক্ষিণের এডিসি (ক্রাইম) অলক বিশ্বাস। তিনি গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনেছেন। অভিযুক্তদের হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ দেয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য রেকর্ডের পর এ বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করা হবে। ঘটনায় অভিযুক্ত শাহ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, এই প্ল্যাটফরম হচ্ছে ‘হাওয়ায় ব্যবসা’। যারা যারা এই হাওয়ায় ব্যবসা করেছিলেন তাদের বিনিয়োগও হাওয়া হয়ে গেছে। তিনি নিজেকে একজন বিনিয়োগকারী ও ভুক্তভোগী বলে দাবি করে বলেন, তিনি কখনো কোম্পানির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের দায়িত্বে ছিলেন না। ফলে কোম্পানির বিষয়ে তিনি অবগত নন।