ওয়ান-ইলেভেন কেন হয়েছিল। কীভাবে হয়েছিল। কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিক আর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকাই বা কী ছিল। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না? মিডিয়ার ভূমিকা কী ছিল। বিএনপি’র ভেতরে কীভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হয়। সংস্কারপন্থিরা দল ভাঙার জন্য কীভাবে সক্রিয় হয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বৈঠক। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন, ব্যবসায়ীদের হয়রানির পেছনে কারা যুক্ত ছিলেন তার কিছু বিবরণ বেরিয়ে এসেছে সামপ্রতিক অনুসন্ধানে। এ ছাড়া ২০০৮-এর নির্বাচন কেমন ছিল? কীভাবে চার কুশীলব জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারী দেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছিলেন তাও জানা গেছে এই অনুসন্ধানে।
২০০৪ সন থেকে রাজনীতির অস্থিরতা শুরু হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলে। দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা ঘটে। সামগ্রিক পরিস্থিতির পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। পশ্চিমা দুনিয়ায় ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। বলা হয়, বাংলাদেশে এখন সন্ত্রাসবাদের উর্বর ভূমি। একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলার ঘটনাও ঘটে। জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর আনুষ্ঠানিক উত্থান হয়।
এতে প্রতিবেশী দেশে অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা মনে করে, এর পেছনে সার্কভুক্ত একটি দেশের যোগসূত্র রয়েছে। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণে প্রতিবেশী বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে- এটা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে প্রচার করতে থাকে। এতে বিদেশিদের মধ্যে বিএনপিবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়। ২০০৬ সনের শেষদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। বায়তুল মোকাররমের কাছে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার উল্লাসের নৃত্য করা হয়। তখনই মাইনাস টু ফর্মুলা সামনে আসে। পশ্চিমা দেশগুলো এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস ও ইইউ প্রতিনিধিরা সরাসরি মাইনাস টু ফর্মুলা নিয়ে এখানে সেখানে আলোচনায় লিপ্ত হন। বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। তিনি জেনারেল মাসুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এতে করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় দু’জনের মধ্যে। জেনারেল মাসুদ তখন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। সরকার পদ্ধতি নিয়ে রাজপথ তখন উত্তপ্ত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। অনুসন্ধান বলছে, পরিকল্পিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণা করা হয়। বিচারকদের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। এতে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন হাসিনা ও তার মিত্ররা। বিদেশি কূটনীতিকরা বিরক্ত হন। নানাভাবে পরিস্থিতি উস্কে দেয় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা গোটা পরিস্থিতিকে বেসামাল করে দেয়। শেখ হাসিনা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এর পেছনেও গোয়েন্দাদের হাত ছিল। বিএনপি’র ভেতরেও সংস্কারপন্থিদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়।
কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বে এলডিপি গঠনেও গোয়েন্দাদের মদত ছিল। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নেন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও তার সহযোগীরা। এরপরেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। পরিণতিতে আসে ওয়ান-ইলেভেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট (অব.) শেখ মামুন খালেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের চৌধুরী ও মেজর (বরখাস্ত) মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরী এ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকার গঠনের পেছনে অন্তত আটজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন জেনারেল মইন, জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, রিয়ার এডমিরাল এম হাসান আলী খান, এয়ার ভাইস মার্শাল শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং মেজর জেনারেল (অব.) সাদেক হাসান রুমি।
সামপ্রতিক অনুসন্ধানে এদের অবস্থান উঠে এসেছে। বিএনপি’র কতিপয় সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এর মধ্যে বিচারকদের বয়স বাড়ানো এবং ইয়াজউদ্দিনকে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করা। এসব ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। যদিও আগেই উত্তপ্ত ছিল রাজপথ। দৃশ্যপটে আসে সেনাবাহিনী। জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বঙ্গভবনে ইয়াজউদ্দিনকে হটাতে তিন বাহিনীর প্রধানরা হাজির হন। নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ট্যাংক বাহিনী নিয়ে ক্ষমতা দখলের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ব্রিগেডিয়ার আমিনও তখন বঙ্গভবনে। শেখ হাসিনা তখন মিটি মিটি করে হাসছেন। কিন্তু ক’দিন বাদেই তাকে সেনা কব্জায় নেয়া হয়। যদিও তার সঙ্গে জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারী, ব্রিগেডিয়ার আমিন কয়েক দফা বৈঠক করেন। বলা হয়ে থাকে, তার সম্মতিতেই ওয়ান-ইলেভেন আসে। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ওপর নির্যাতনের কাহিনী ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার বারী জানিয়েছেন, তিনি নির্যাতনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অবশ্য তিনি তখন সিটিআইবি’র পরিচালক ছিলেন। ওদিকে সেনা তৎপরতায় স্থবির হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। টাস্কফোর্সের প্রধান জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে জাহির করতে থাকেন। ট্রুথ কমিশনের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা ছিল একটি ফাঁদ। এতে তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ চাউর হতে থাকে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন ছিল ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের অন্যতম পুঁজি। রাজনীতিবিদদের অনেক বিবৃতি মিডিয়াতে প্রচার করা হয়। কয়েকজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে থাকেন। প্রফেসর ইউনূস সরকার প্রধান হতে রাজি হয়েও হননি। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিয়ে তার সঙ্গে মতবিরোধ হয়। তারই পরামর্শে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হন। জেনারেল মইনের মধ্যে পুরো ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার ইচ্ছা জাগে। সহকর্মীদের বলতে থাকেন, এভাবে দ্বৈত শাসন চলতে পারে না। কোনো উপকারেও আসবে না। তাই তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ হয়। কিন্তু সহকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। উচ্চাভিলাষী আমিন এতে সায় দেননি। তার ইচ্ছা ছিল ক্ষমতা নেয়ার। মইন চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট হয়ে ফৌজি শাসনের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
মাঝখানে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব ব্রিগেডিয়ার বারীকে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে মিলিটারি অ্যাটাশে হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার আমিন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে। প্রতিনিয়তই তিনি সেখানে যেতেন। এই যোগাযোগের কারণে তার সঙ্গে দূতাবাসের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রতিনিধির ভূমিকা ছিল অনেকটাই রহস্যজনক। আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা লক জানিয়েছিলেন সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হুমকির মুখে পড়বে। এই হুমকির কারণে সেনাবাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, উক্ত চিঠির ব্যাপারে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সমর্থন ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন ছিল। কেয়ারটেকার সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তার ভূমিকা নিয়েও সে সময় নানা প্রশ্ন উঠে।
মইন ইউ আহমেদের ভারত সফর ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ঘোড়া ডিপ্লোম্যাসির কাছে মইন অনেকটা আত্মসমর্পণ করেন। নির্বাচনের দিকে যায় দেশ। তবে সেটা ছিল নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের ছক তৈরি হয় পশ্চিমা একটি দেশে। যেখানে বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সিঙ্গাপুরে গোয়েন্দাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে পার্শ্ববর্তী দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো। যদিও গ্রেপ্তারকৃত মামুন খালেদ নানাবিধ প্রশ্নের জবাবে তার ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পাঁচজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন।
তারা হলেন- তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মোহাম্মদ, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সিটিআইবি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন, তৎকালীন এমএসপি মেজর জেনারেল (অব.) আলমগীর কবীর ও এনএসআই-এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামস। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে নির্বাচনে মইন ইউ আহমেদ ডিজিএফআই’র সহযোগিতা নেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২৬২টি আসন লাভ করে। পক্ষান্তরে বিএনপি পায় মাত্র ৩০ আসন। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এমন ফলাফল হবে আগেভাগেই তা জানতে পেরেছিলেন। ২০০৮ সনের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই বিপুল পরিমাণ ব্যালট ছাপানো হয়। শুধু সামরিক কর্মকর্তা নয়, নির্বাচন কমিশনও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে। এর সঙ্গে যোগসাজশ ছিল দেশি- বিদেশি নানা মহলের।