Image description

দেশের উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সংখ্যায় অনেক। অথচ গুণগত মানসম্পন্ন গবেষণায় পিছিয়ে যোজন যোজন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন। আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় জাঁকজমকপূর্ণ ভবন নির্মাণে। গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে নামমাত্র অর্থ। ল্যাবরেটরি ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব প্রকট। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন মৌলিক গবেষণায়। গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষা শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থনির্ভর তাত্ত্বিক জ্ঞান দিচ্ছে, যা কর্মবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। গবেষণার অভাবে প্রজন্মের এই নিস্তেজ বিকাশ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য সৃষ্টি করছে বড় ধরনের ঝুঁকি।

শিক্ষাবিদদের অনেকেই বলছেন, উচ্চশিক্ষা এখন শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম। শিক্ষার্থীরা সীমাবদ্ধ থাকছেন তাত্ত্বিক গণ্ডিতেই। নেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কোনো উদ্যোগ। এটি মেধাবী প্রজন্মের সৃজনশীলতা নষ্ট করছে। বিশ্ব জুড়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের জয়জয়কার, তখন দেশের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত আধুনিক সম্পদ থেকে। ফলে বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মীর জন্য নির্ভর করছে বিদেশিদের ওপর। তাত্ত্বিক শিক্ষা ও কর্মবাজারের চাহিদাই এখন সম্পূর্ণ বিপরীত।

 

 

সেকেলে নীতি ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাই এ খাতের প্রধান বাধা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ফাইল নিষ্পত্তিতে লাগে মাসের পর মাস। এ ছাড়া শিক্ষার ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাট পরোক্ষভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। এটি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি বোঝা। পর্যাপ্ত সরকারি অনুদান ও গবেষণা তহবিলের অভাবে উদ্ভাবনী কাজ থমকে আছে।

 

বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থান পায় না। এর অন্যতম কারণ গবেষণার নিম্নমান। অনেক ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেটের জন্য দায়সারা গবেষণা জমা দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের না হলে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতিকে মিলিয়ে ফেলছে। ফলে গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। মুনাফামুখী মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে উচ্চশিক্ষা তার মূল লক্ষ্য হারাবে।

 

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই খাতের সমস্যা সমাধানে কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছে। ১৯৯২ সালের মূল আইনের চেতনা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা চলছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার নজির রয়েছে। তাই স্বাধীনতার পাশাপাশি সরকারের কার্যকর তত্ত্বাবধান জরুরি।

 

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়; বরং শিল্পকারখানার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করতে হবে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং ক্যাপস্টোন প্রজেক্টের ব্যবস্থা থাকতে হবে। উন্নত দেশগুলোর আদলে দক্ষতাভিত্তিক এবং ফলাফলমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য শাখা ক্যাম্পাস স্থাপনের অনুমতি এবং ক্রস-বর্ডার হায়ার এডুকেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করতে হবে, তবে এক্ষেত্রে বজায় রাখতে হবে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণও।

 

 

বর্তমানে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এ খাতের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে অভাবনীয় ভূমিকা রাখছেন। তবে এই অগ্রযাত্রার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু সেকেলে নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা। সম্প্রতি এক গোলটেবিল আলোচনায় শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকরা একমত হয়েছেন, যদি সঠিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এ খাতটিই হবে বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ওপর টিউশন ফির চাপ বৃদ্ধি এবং গবেষণায় পর্যাপ্ত সরকারি তহবিলের অভাব মেধাবী প্রজন্মের বিকাশকে কিছুটা নিস্তেজ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা খাতের ওপর আরোপিত কর এবং ভ্যাট পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা নিরসন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

 

মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী কাজে সহায়তায় একটি বিশেষ অনুদান তহবিল গঠনের পাশাপাশি প্রশাসনিক গতিশীলতা আনতে ইউজিসিকে সংস্কার করতে হবে। ইউজিসিকে দেওয়া প্রতিটি ফাইল নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪৫ দিনের সময়সীমা নিতে হবে। এ ছাড়া গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের হারের ভিত্তিতে স্বচ্ছ কেপিআই ও র‍্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

গবেষণার সুযোগ না থাকায় দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কতটা পিছিয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘গবেষণা মানে তো নতুন কোনো জ্ঞান পৃথিবীতে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শুধু একটা সার্টিফিকেটের জন্য এমন গবেষণা জমা দেন। আর যেসব শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকে, তারা নিজে থেকেই এসব অর্জন করেন। গবেষণা আন্তর্জাতিকমানের না হলে সেটা গ্রহণযোগ্যই করা উচিত নয়।’

 

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিছিয়ে থাকার পেছনে গবেষণার অভাব কতখানি দায়ী, সে বিষয়ে অধ্যাপক তৌহিদুল বলেন, ‘র‍্যাংকিং করার জন্য সবাই বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি গবেষণাকে বেছে নেন। গবেষণার জন্য কিছু বিশেষ বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে, যেগুলো তারা মানেন না। এ কারণেই মূলত তারা দেশের র‍্যাংকিংয়েই থাকতে পারেন না, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং তো দূরের কথা।’

 

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠানের ছক থেকে বেরিয়ে না আসে, তবে উচ্চশিক্ষা তার মূল লক্ষ্য হারাবে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে গবেষণায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এখন সময় এসেছে অবকাঠামোর চাকচিক্যের চেয়ে মেধার লালন ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে বিনিয়োগ করার।

 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিস্তারিত সমস্যা শোনার পর শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা আজকে এসেছি, সমস্যাগুলো শুনলাম। এখন আমরা একটি কমিটি করব এবং প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা লালন করেছিলেন এবং ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করেছিলেন, তা বহালের ব্যাপারে কাজ করব।’

‘২০১০ ও ২০২৫ সালে এটিকে পরিবর্তন ও সংশোধন করে সরকারি প্রশাসনের অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। এভাবে যদি আমরা কঠোর মনিটরিং করে রেড ফ্ল্যাগ লাগাতে থাকি, তাহলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী দিনে কাজ করতে পারবে না। তাদের নিজেদের মতো করে স্বাধীন থাকতে দিন। আমরা তত্ত্বাবধান করব। কিন্তু এমন স্বাধীনতা দেব না, আবার হলি আর্টিসান যেন না হয়। এটা একদম অবিশ্বাস্য— একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জঙ্গি কারখানায় পরিণত হয়েছিল। তাই আমাদের এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। এটির জন্যই সরকার। এ কারণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে’— যোগ করলেন শিক্ষামন্ত্রী।