ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের আর খুব বেশি দেরি নেই। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৭ মে যদি কোরবানির ঈদ হয় তাহলে হাতে সময় আর মাত্র ১৯ দিন। সে হিসাবে আগামী ১০-১২ দিন পরই রাজধানীসহ সারাদেশে বসবে কোরবানি পশুর হাট। কোরবানি মুসমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিধান। তবে কোরবানি দেশে আমিষের অভাব পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামাজিকভাবে পুষ্টির জোগান দেয়ার এটি একটি বড় উৎস। দেশের গ্রামে-গঞ্জে অনেক দরিদ্র পরিবার আছে যারা সারা বছর গোশত কিনে খেতে পারে না। কোরবানির সময় ধনীরা তাদের কোরবানির একটি বড় অংশ গরিব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করেন। এর ফলে অসহায় গরিবরা সামান্য হলেও গোশত খেতে পারে। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশব্যাপী পশুর খামারিদের মধ্যে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সারাদেশে খামারিরা তাদের গরু-ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত করতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তবে খামারিদের ভয়Ñ যদি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করে, তাহলে তাদের লোকসানে পড়তে হবে। এমনিতে গত কয়েক বছর যাবৎ কোরবানির হাটে চাহিদার চেয়ে বেশি পশু সরবরাহ হয়। আর তাতে অনেক পশু অবিক্রিত থেকে যায়।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, আসন্ন ঈদুল আজহায় দেশে মোট এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু অতিরিক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষ রয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট-দুম্বাসহ অন্যান্য পশুর সংখ্যা পাঁচ হাজার ৬৫৫টি। এবার সারাদেশে তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতে থাকবে ২৭টি। গত বছর কোরবানি পশুর বাণিজ্যে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৬৯ হাজার ১৪১ কোটি ১২ লাখ টাকা। এবার কোরবানির পশুর বাজারে সম্ভাব্য লেনদেন হতে পারে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
গত কয়েক বছর যাবত ভারতীয় গরু আদমানি বন্ধ থাকায় দেশে প্রচুর গরুর খামার গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের খামারে গরু লালন পালন করে দেশকে প্রাণিসম্পদে যেমন সয়ংসম্পূর্ণ করেছেন, তেমনি বেকারত্বে অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাবলম্বি হয়েছেন। আমাদের দেশ প্রাণি সম্পদে এখন সয়ংসম্পূর্ণ। দেশীয় খামারিরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্ষম। দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সরকারের যথাযথ সহায়তা, প্রণোদনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশ এখন পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। ফলে এখন আর দেশের বাইরে থেকে কোরবানির জন্য পশু আমদানির প্রয়োজন হয় না। গতবছর ঈদুল আজহাতেও দেশে পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি ছিল। গেল বছর দেশে প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি দেয়া হয়েছে। তারপরও প্রায় ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রিত বা উদ্বৃত্ত ছিল। এ অবস্থায় যদি সীমান্ত পথে অবৈধ ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করে তাহলে খামারিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
খামারিরা জানান, এমনিতেই পশু লালন পালনে তাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম প্রচুর বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় ৪০ কেজি ওজনের গমের ভূষির বস্তা ৩০০, মসুরের ২০০, এ্যাংকারের ২০০ ও ধানের গুড়ায় ৩০০ টাকা করে দাম বেড়েছে। ধানের শুকনা খড়ের দামও মণ প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। দুই বছরে খাদ্যের দাম কোনোটায় হাজার টাকাও বেড়েছে। এভাবে সবক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে। গরুতে মণ প্রতি ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার টাকার মতো। যারা খামারে লোক রেখে গরু পালন করেন তাদের খরচ আরো বেশি। এক্ষেত্রে মণপ্রতি দেশি গরুতে কমপক্ষে ৩৩-৩৪ হাজার টাকা দাম না পেলে খামারিদের লোকসান হবে। শংকর জাতের গরুগুলোর দাম হতে হবে মণ প্রতি ৩২ হাজার টাকার মতো। তা না হলে অধিকাংশই লোন পরিশোধ করতে পারবেন না।
খামারিদের অনেকের স্বপ্ন এবার পশুর সঠিক দাম পেলে আগামীতে খামার আরো বড় করবেন। কিন্তু পশুর দাম না পেলে অনেক খামারি নিঃস্ব হয়ে যাবেন। এবার অনেক বড় ষাড় পালন করছেন ছোট-বড় খামারিরা। চড়া দামের খর, খৈল, গমের ভাত, কাচা ঘাস, ভুষি ও নালী, খাবার দিয়ে এসব গরু মোটা-তাজা করা হচ্ছে। তাদের আশা, এসব গরু ঈদ হাটে বিক্রি করে তারা লাভবান হবেন। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক যে দুরবস্থা তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংসার চালাতে ত্রাহি অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে দেশে কোরবানির সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে যিনি একা কোরবানি দিতেন এবার হয়তো তিনি অন্যজনের সাথে ভাগে কোরবানি দেবেন। সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর যথাযথ মূল্য পাওয়া নিয়ে এমনিতেই খামারিরা শঙ্কিত। তার উপর যদি সীমান্ত পথে অবৈধ ভারতীয় গরু আসে তাহলে তাদের পথে বসতে হবে। খামারিরা বলেন, দেশে পর্যাপ্ত গরু রয়েছে। কোনোভাবেই যাতে ভারত থেকে গরু না আসতে পারে, সেদিকে প্রশাসনকে নজর রাখতে হবে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে আল আইমান অ্যাগ্রোর ম্যানেজার আসিফ বলেন, সরকার পশু আমদানির অনুমোদন দেয়নি, এটি দেশীয় খামারিদের জন্য অবশ্যই সুখবর। তবে বর্ডার দিয়ে গরু চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারলে এর প্রকৃত সুফল খামারিরা পাবে না। ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশের খামারিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়বেন।
তবে এ ব্যাপারে খামারিদের আশ্বস্ত করেছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। তিনি বলেছেন, আমাদের দেশীয় খামারিরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্ষম। সরকারের নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশ এখন পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। ফলে এই বছর কোরবানির জন্য বিদেশ থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভারতীয় গরু আসা ঠেকাতে বিজিবি ও পুলিশের কঠোর নজরদারি থাকবে। মন্ত্রী বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদার তুলনায় বরং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।