সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্যদের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা। মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও আছে তাদের। আছে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইচ্ছা থাকলেও তারা মাঠপর্যায়ের উন্নয়নমূলক কাজে খুব একটা অবদান রাখতে পারেন না। এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত সাধারণ সংসদ-সদস্যরা। কখনো আবার তাদের নিজ এলাকায় ঢুকতে গেলেও বাধার মুখে পড়তে হয়। নারী সংসদ-সদস্য হিসাবে নানা রকম তিক্ত অভিজ্ঞতারও সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া আইনি ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতায় মানুষের জন্য উন্নয়ন কাজে যুক্ত হওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে এসব বাধা-বিপত্তির অবসান চান নারী সংসদ-সদস্যরা। মানুষের কল্যাণে তারাও অবদান রাখতে চান। কয়েকজন নারী সংসদ-সদস্য যুগান্তরকে তাদের এ আকাঙ্ক্ষার কথা জানান।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যক্রম ও বাজেট পাশসহ সংসদীয় কার্যক্রমে সাধারণ সংসদ-সদস্যদের মতো নারী সংসদ-সদস্যদের সমানভাবেই অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। বেতন-ভাতাসহ সব অধিকার একজন সাধারণ সংসদ-সদস্যের মতোই তারা সমানভাবে পান। কিন্তু সংসদের বাইরে তাদের কার্যক্রম একেবারে সীমিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান পদ্ধতিতে নারীর ক্ষমতায়ন খুব একটা হচ্ছে না। ফলে নারী আসনে সরাসরি ভোট আয়োজনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি।
নারী সংসদ-সদস্যদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় বলে যুগান্তরকে জানান বিএনপিদলীয় সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে সাধারণ সংসদ-সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সমান। কিন্তু সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্যদের নির্বাচনি এলাকা নিয়ে কনফিউশন আছে। এই সুযোগে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যের সঙ্গে নারী সদস্যের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তারা (সাধারণ সংসদ-সদস্য) ডিসি-এসপিকে বলে দেন, আমি যা বলব সেটাই হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের বলে দেওয়া হয়, নারী সংসদ-সদস্যদের কর্মসূচিতে কেউ যেন অংশ না নেয়। অংশ নিলে তাকে দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। এভাবে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করা হয়।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন। অথচ আমাদেরকে যদি এভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয় তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কীভাবে হবে?’
নিলোফার চৌধুরী মনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নের জন্য সাধারণ সংসদ-সদস্যদের সরকারিভাবে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই বরাদ্দ নারী সংসদ-সদস্যরা পান না। আমি মনে করি, নারী সংসদ-সদস্য হিসাবে জনগণের কাছে আমাদেরও জবাবদিহি আছে। এই বরাদ্দ আমাদেরও পাওয়া উচিত। তাহলে আমরাও জনগণের কল্যাণে আরও বেশি কাজ করতে পারব। তিনি আরও বলেন, নারী সংসদ-সদস্যদের কোনো কার্যালয় নেই। তবে তাদের কার্যালয়ের ভাড়া ও অফিস পিওনের একটা ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু যেই অঙ্কের ভাতা দেওয়া হয়, তা খুবই সামান্য। আমি মনে করি, নারী সংসদ-সদস্যদের জন্য কার্যালয় থাকা উচিত।’
তবে সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য হলেও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করবেন বলে জানান বিএনপির আরেক সদস্য সাবিরা সুলতানা। তিনি বলেন, যেহেতু সংরক্ষিত নারী আসনে আমি নির্বাচিত হয়েছি, সেহেতু নারীদের অধিকার আদায়ে অবশ্যই অগ্রাধিকার দেব। যেখানে দেশের ৫১ শতাংশ নারী, সেখানে তাদের জন্য কাজ করব। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারীদের উন্নয়নে যে কাজ করতে চান, আমি সেই কাজকে সবার আগে প্রাধান্য দেব। তিনি বলেন, সাধারণ আসনে নির্বাচন করেও জয়ী হতে পারিনি। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে কাজ করার জন্য সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দিয়ে এমপি করেছেন। ফলে আমি অন্তত আমার নির্বাচনি এলাকায় সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্যের কাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পার্থক্য দেখি না। সাংগঠনিকভাবে আমাদের দলের যে কাজ আগেও ছিল, সেটি অব্যাহত থাকবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।
সাবিরা সুলতানা বলেন, সংসদ-সদস্য হিসাবে আমার কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে সাধারণ সংসদ-সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য উভয়ের অধিকার সমান হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এজন্য যদি কখনো মনে হয় আইনে পরিবর্তন আনা দরকার, সেই বিষয়ে আমরা সবাই মিলে সংসদে কথা বলব।
স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের জন্য কার্যালয় না থাকায় তাদের কাছে সাধারণ মানুষের যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়ে। তৃণমূলে কাজ করতে গেলে অনেক সময় সরাসরি নির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কিংবা দ্বন্দ্বের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে নানা সময়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, কোনো এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ বা টিআর-কাবিখাসহ সরকারি অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা তেমন গুরুত্ব পান না। আবার কেউ কেউ নিজ নির্বাচনি এলাকায় প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠেন, যা শেষ পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচিত সংসদ-সদস্যের সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে রূপ নেয়।
এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘যতটুকু জানি উপজেলা পর্যায়ে যে কার্যালয় হচ্ছে সেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যরা বসতে পারবেন। এ সংক্রান্ত পরিপত্রে এভাবে উল্লেখ আছে। আশা করছি, সমস্যা হবে না।’
এদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজের জন্য অন্যতম বড় বাধা বলে মনে করেন জামায়াত জোটের নারী সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী। তিনি বলেন, আইন ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্যরা বৈষম্যের শিকার। এখানে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি। নইলে নারী সংসদ-সদস্যদের কাজ করা কঠিন হবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে সংসদ-সদস্য হয়েছি, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব না। তিনি বলেন, আমরা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে অনেক প্রতিবন্ধকতা উতরাতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
নারী সংসদ-সদস্যদের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা বলে জানান জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিত এনসিপি নেত্রী মাহমুদা আলম মিতু। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নিজ এলাকার অসংখ্য মানুষ ফোন করে তাদের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। সড়ক সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কথা বলছেন। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পারব-তা আমি নিশ্চিত নই। তবে আমি মনে করি, নারীদের সত্যিকারের উন্নয়ন করতে হলে তাদের কাজ করার ক্ষমতাও দিতে হবে। তিনি বলেন, যতটুকু জেনেছি, আমাদের কাজ করার সুযোগ অনেক কম। এ সুযোগ অবশ্যই বেশি থাকা উচিত। তিনি বলেন, নারীদের নির্দিষ্ট এলাকায় এক্সেস থাকা উচিত। সংসদ-সদস্য হিসাবে আমাকে সবকিছু দিচ্ছেন, কিন্তু এলাকার এক্সেস নেই। এ কারণেই আমি চাইলেও অনেক কিছু করতে পারছি না। একই এলাকায় সাধারণ সংসদ-সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্য কাজ করলে দ্বন্দ্ব হওয়ার পথ তৈরি হবে কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ আছে।
তবে সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্যদের সত্যিকারের ক্ষমতায়িত করতে হলে সরাসরি নির্বাচন আয়োজন করতে হবে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। এছাড়া সত্যিকারার্থে নারীর ক্ষমতায়ন চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়নের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ১০০টিতে উন্নীত করার প্রস্তাব করে। প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারশ আসনের মধ্যে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে একশ আসন নির্ধারণ করে সেখানে সরাসরি নির্বাচন করা দরকার। ওই একশ আসনে রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নারীদের প্রার্থী করবে। এটি বাস্তবায়িত হলে নারীর ক্ষমতায় নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারীদের পশ্চাৎপদ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে, যা মোট আসনের মাত্র ১৪ শতাংশ। এই পদ্ধতিতে নারী আসনের সদস্যদের খুব একটা করণীয় থাকে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবের কাছে তাদের কার্যত হার মানতে হয়।