ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে বিএনপি। সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো সারা দেশের সাংগঠনিক নেতাদের নিয়ে সভায় বসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর লক্ষ্য সাংগঠনিকভাবে দলকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি বিএনপিসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের বার্তা দেওয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে, বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে করণীয়, সংগঠনের শৃঙ্খলা যথাযথভাবে পালন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও মূল দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সভায় দেওয়া হবে নানা দিকনির্দেশনা। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরতে তৃণমূল নেতাদের মাঠে থেকে কাজ করারও নির্দেশনা দেবেন দলীয় প্রধান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
কাল শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সাংগঠনিক ইউনিটের সঙ্গে দিনব্যাপী মতবিনিময় সভা করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সারা দেশের জেলা ও মহানগরের শীর্ষ দুই নেতা অংশ নেবেন। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত থাকবেন। এ সভা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে নেতারা ঢাকায় আসা শুরু করেছেন।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসাবে এই মতবিনিময় সভা। সকাল ১০টা থেকে দিনব্যাপী সভা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, নির্বাচনে বিএনপি একটা বড় বিজয় অর্জন করেছে, সরকার গঠন করেছে। এরপর তো সংসদ অধিবেশন ছিল। ফলে দীর্ঘদিন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে চলছে, কীভাবে আছে, মাঠপর্যায়েও কিছু কথা আছে, পরামর্শ আছে-এসব সম্পর্কে দলের চেয়ারম্যান হয়তো কিছু জানবেন এবং এ বিষয়ে নেতাদের কিছু মতামত নেবেন এবং দিকনির্দেশনা দেবেন। এক কথায় সরকার গঠন করার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় শুরু। এরপর পর্যায়ক্রমে সংগঠনের কি অবস্থা, বিশেষ করে জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা-এসব লেভেলে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আবার সুন্দর করে গঠন, পুনর্গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান নিয়মিত উনার দলীয় অফিসে সপ্তাহে অন্তত ২ দিন সময় দেবেন বলে আমরা আভাস পেয়েছি।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক মতবিনিময় সভায় সংগঠনের ৮১ ইউনিটের সব সভাপতি বা আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক বা সদস্য সচিব (দুজন করে) উপস্থিত থাকবেন।
বিএনপি সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর নেতারা সার্বক্ষণিকভাবে যার যার মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছেন যারা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাও। তারা সরকারি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় যার যার সংগঠনে সময় দিতে পারছেন না। ফলে এসব অঙ্গসংগঠনসহ খোদ বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে অনেকটা স্থবিরতা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের ভেতর থেকে তাগিদ উঠে সরকারের পাশাপাশি দলকে সক্রিয় করার। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দল ও বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর কথাও বলেন কেউ কেউ। এরই ধারাবাহিকতায় দলকে সাংগঠনিকভাবে সচল ও সক্রিয়তার উদ্দেশে নেতাদের ঢাকায় ডেকেছে বিএনপি।
সূত্র আরও জানায়, রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততায় রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলের আদর্শিক চর্চা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। কর্মীদের মধ্যে আগের মতো উদ্দীপনা ও সক্রিয় কর্মকাণ্ড নেই। অনেকেই দলীয় কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তাই সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতবিনিময় সভা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কেননা তিনি দেশে ফেরার পর সারা দেশের জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিট নেতাদের সঙ্গে এটাই প্রথম মতবিনিময় সভা।
বিএনপির নেতারা জানান, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় সভায় আলোচনা হবে। বিশেষ করে দল পুনর্গঠন ও দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে সভায়। এছাড়া সেখানে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার্যক্রমের মূল্যায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হতে পারে। যেন সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছে সরকারের সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন সভায় উপস্থিত নেতারা।
এদিকে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর দলের জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকেও তা হয়নি। তবে এ সময়ে দলের নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কাউকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতেও কাউন্সিল করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন একাধিক নেতা। কাউন্সিলের দিনক্ষণ ঘোষণার জন্য দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে স্থায়ী কমিটি। সেজন্য ধারণা করা হচ্ছে বিএনপির কাউন্সিলের বিষয়েও সভায় আলোচনা হতে পারে।
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষের দিকে বিশেষ করে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবেন। এর মধ্যে বিরোধী দলের কর্মসূচির বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, জনগণের মাঝে এ নিয়ে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ একশর বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ জনগণের মাঝে তুলে ধরতে কিছু কর্মসূচি পালনের বিষয়ে নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
সভা প্রসঙ্গে মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন যুগান্তরকে বলেন, জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সভায় অংশ নেবেন। তবে সভার এজেন্ডা কি তা জানানো হয়নি।
এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এই মতবিনিময় সভা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শেষ সভা হতে পারে। কারণ এই তিন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি শিগগিরই দেওয়ার কথা রয়েছে।