Image description

বাংলাদেশ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায়  স্থলভাগের আরও গভীরে কূপ খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে মাটির গভীরে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। আগের ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের রেকর্ড ভেঙে এবার ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর থেকে উত্তোলন করা হবে প্রাকৃতিক গ্যাস। এই গভীরতায় কূপ খননকে ‘ডিপ ড্রিলিং’ বলা হয়। সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)-এর  তিতাস-৩১ কূপে এই গভীরতায় চারটি স্তরে প্রায় ২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের খোঁজে সেখানে এখন চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

সরেজমিন কূপ খনন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চায়না ন্যাশনাল কোম্পানি এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর সঙ্গে বিজিএফসিএল-এর দক্ষ কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করছে। বাংলাদেশ এর  আগে স্থলভাগে এত গভীরে কূপ খনন গভীরতায় আর যায়নি।

এই কূপের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহামুদুল নওয়াব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখানে প্রথমবারের মতো ২ হাজার ৬৮২ অশ্বশক্তির রিগ ব্যবহার হচ্ছে। এটি দেশে আসা নতুন একটি রিগ। একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে ভূতাত্বিকরা তিতাসের গ্যাস ক্ষেত্রে ১৯৮৪ সালে ৫ কিলোমিটার কূপ খননের কথা বলেছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকায় যা এতদিন না হলেও ২০২৬ সালে এসে করছি।

এই কূপের চারটি স্তর আছে। যেগুলো হচ্ছে ভুবন ১, যা ৩ হাজার ৭৩৬ মিটার থেকে ৩ হাজার ৭৬৫ মিটার গভীরে। আরও আছে বড়াইল ১, বড়াইল ২ এবং বড়াইল ৩। এগুলো যথাক্রমে ৪ হাজার ১৪৩ থেকে ৪ হাজার ১৬৫ মিটার, ৪ হাজার ৩৯৬  থেকে ৪ হাজার ৪২২ মিটার এবং ৫ হাজার ৩১৫ থেকে ৫ হাজার ৩৪৪ মিটার পর্যন্ত গভীরে অবস্থিত। এখানে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভবনাও বেশি থাকে।

তিতাসের এটিই প্রথম ডিপ ড্রিলিং। এটি খনন শেষে বাখরাবাদ ১-এ আরেকটি কূপ খনন করা হবে। এটি ৪ হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হবে। সেখানে এখন ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। এ ছাড়া রিগসহ অন্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও শুরু হচ্ছে। এই রিগ দিয়ে বাপেক্সের আওতায় আরও দুটো কূপ খনন শুরুর কথা।

বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আবদুল জলিল প্রামাণিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এর আগে ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত সর্বোচ্চ কূপ খননের রেকর্ড আছে। তিতাস-৩১ এর এই দূরত্বে থ্রিডি সিসমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চারটি স্তরে গ্যাসের সম্ভাব্য হাইড্রোকার্বন লেয়ারের উপস্থিতি আছে। এ কূপে দুই টিসিএফের মতো গ্যাসের উপস্থিতি আছে বলে ধারণা করছি। খনন শেষে আমরা চূড়ান্তভাবে কত পরিমাণ গ্যাসের মজুত আছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারব। কূপ খনন শুরুর পর থেকে এটি শেষ করতে ২১০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। তবে কোনো সমস্যা না হলে কাজ আরও আগেই শেষ হবে বলে আশা করছি। গত ১৯ এপ্রিল এর খনন কাজ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ১৩০০ মিটারের বেশি পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়েছে। বিজিএফসিএলের আওতায় একটি প্রকল্পে দুটো কূপ খনন করা হচ্ছে। এর প্রকল্প ব্যয় ৫৯৪ কোটি টাকা। চায়না ন্যাশনাল কোম্পানি কূপ খননে সহায়তা করছে।

জানা যায়, যন্ত্রপাতির অভাবে আগে কূপে খননের সময় উচ্চচাপ পেলেই সেখান থেকে সরে আসতে হতো। এত বড় রিগও আগে ছিল  না। এই কূপে ১৫ হাজার পিএসআই উচ্চ চাপ সামলানোর মতো ব্যবস্থা আছে। এ চাপে নিরাপদে কূপ খনন শেষ করা যাবে বলে এই কূপ খননে জড়িত কর্মকর্তারা আশা করছেন। এই কূপ খনন সফল হলে এর গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এরপর গ্যাস পাওয়া-সাপেক্ষে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ডের পর গ্যাস পাইপলাইন বসাতে ছয় মাস সময় লাগবে।

এর আগে বাংলাদেশে স্থলভাগে যে কাজগুলো করা হয়েছে তা ২ডি জরিপের ওপর নির্ভর করে করা হয়েছে। সেখানে সাব সারফেসের এত ভালো তথ্য ছিল না। আগে স্বাভাবিক চাপ পর্যন্ত খনন কাজ করা হতো। উচ্চ চাপে খনন কাজ থেকে সরে আসা হতো। এখন পুরো পৃথিবীতে উচ্চ চাপে কূপ খননের জন্য ভালো প্রযুক্তি আছে। তিতাস-৩১ এ ১৫ হাজার পিএসআই চাপে খননের সব প্রস্তুতি আছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে গভীর কূপ খননের  সম্ভাবনা আরও  খুলে যাচ্ছে। এই কূপ দিয়ে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।