Image description
মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ ১০২ কোটি টাকা

জাপানের জেরা কোম্পানির ৭১৮ মেগাওয়াটের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিপাকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগ। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র। কোনো রকম টেন্ডার ছাড়া প্রথমে রিলায়েন্স গ্রুপ ভারত থেকে তাদের পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র এনে বসিয়েছে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে। চালু হওয়ার আগেই রিলায়েন্সের এই কেন্দ্রটি কিনে নেয় জাপানের জেরা কোম্পানি। এখন এটির ক্যাপাসিটি চার্জ, গ্যাস সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমস্যায় বাংলাদেশ সরকার।

দেশে গ্যাসের মারাত্মক সংকট। মাঝেমধ্যে এই কেন্দ্রকে গ্যাস দেওয়া হয়। পুরোনো কেন্দ্র হওয়ায় অন্যান্য কেন্দ্রের চেয়ে বেশি গ্যাস ব্যয় করে এটি। বিশাল এই কেন্দ্রকে প্রতি মাসে অনেকটা বসিয়ে বসিয়ে ১০২ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। জেরার এই কেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জসহ মোট বকেয়া পড়েছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই কেন্দ্রের অন্যতম বিনিয়োগকারী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি সেই বকেয়া পরিশোধ করতে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ওই বকেয়া বিল পরিশোধ না করলে সরকারকে বাজেট সহায়তার ১০০ কোটি ডলার আটকে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে এডিবি। এ ব্যাপারে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-ইআরডি বিদ্যুৎ বিভাগকে তাগাদা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি জানতে চাইলে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এ ব্যাপারে এডিবির ঢাকা অফিসের কাছে জানতে চেয়ে ইমেইল করা হয়। এডিবির মুখপাত্র গোবিন্দ বার ইমেইলে জানান, এই প্রকল্পের আর্থিক এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ইতিবাচকভাবে যাচাই করা হয়েছে। এছাড়া সরকারের সব ধরনের অনুমোদনের কাগজপত্র দেখেই জেরার প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এডিবি। তবে বিল না দিলে এডিবি বাজেট সহায়তা স্থগিত করবে-এ বিষয়ক প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাসভিত্তিক আশপাশের বিভিন্ন সরকারি কেন্দ্র বন্ধ রেখে আপাতত মেঘনাঘাটে জেরা এবং ৫৮৪ মেগাওয়াটের ইউনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হচ্ছে। এই দুই কেন্দ্রের পাশে ৫৮৪ মেগাওয়াটের সামিট মেঘনাঘাট-২ গ্যাসের অভাবে আপাতত বন্ধ আছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জেরার ৭১৮ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি এখন গলার কাঁটা। কারণ গ্যাসভিত্তিক এই কেন্দ্র চালু হয়েছে গত বছরের জুলাইয়ে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই কেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জ এসেছে ৯৪০ কোটি টাকার মতো। সব মিলিয়ে এখন বাকি এক হাজার কোটি টাকার বেশি। পিডিবি বলছে, গত অক্টোবরে এই কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পড়েছে ২৯ টাকা ৮৬ পয়সা। আর গড়ে এ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট ২০ টাকা ৬৯ পয়সা। যা অন্যান্য আইপিপির ক্ষেত্রে ৭ থেকে ৮ টাকা। জেরার এই কেন্দ্র গত আগস্টে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করেনি। তবুও ১০২ কোটি টাকার বিল দিতে হচ্ছে। অক্টোবরে এটির প্ল্যান ফ্যাক্টর ছিল ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ, জানুয়ারিতে (২০২৬) ১১ দশমিক ০৬ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং মার্চে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বসে বসে এভাবে ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়ার নজির খুব একটা নেই।

ক্যাপাসিটি চার্জসহ অন্যান্য মিলে ১ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল নিয়ে বিপাকে পিডিবি। গত মাসে জেরাকে ১০০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও বাকি টাকা পরিশোধের তাগাদা চলছে। সরকারি একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, কেন্দ্রটিতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত এবং বকেয়া বিল পরিশোধে ঢাকার জাপান দূতাবাস থেকেও তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্যাস কোত্থেকে দেবে। দেশে তো গ্যাসের সরবরাহ দিন দিন কমছে।

আগে দেশে দৈনিক ৩০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুটের মতো। এতদিন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস দেওয়া হতো দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে এখন দেওয়া হয় ৯৪ কোটি ঘনফুটের মতো। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, প্রতিবছর গ্যাসের উৎপাদন ১০ কোটি ঘনফুটের মতো কমছে।

পিডিবি জানিয়েছে, জেরাকে বকেয়া পরিশোধ করা কঠিন। কারণ পিডিবির কাছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ না দিয়ে জেরার মতো শুধু বসে বসে অনেক কোম্পানি বিল নিচ্ছে।

বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির জন্য পিডিবি গত বছর ৫৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে অর্থ বিভাগ পিডিবিকে ভর্তুকি দিয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মতো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী এখন এই ভর্তুকি কমিয়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা করতে হবে সরকারকে। এখন জেরার মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র খুব বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও হাতির খোরাকের মতো মাসে মাসে বিশাল অর্থের বিল দিতেই হচ্ছে সরকারকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপ বিশেষ আইনে (কোনো টেন্ডার ছাড়া) ৭১৮ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্র বসানোর অনুমোদন পায়। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, জেরা, সামিট মেঘনাঘাট-২ এবং ইউনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অনেকটা জোর করে গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল পেট্রোবাংলা থেকে। অথচ সবাই জানে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে।

অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি তদন্ত করতে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ২০ জানুয়ারি রিপোর্ট প্রকাশ করে।

সেখানে বলা হয়েছে, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে রিলায়েন্সের ৭১৮ মেগাওয়াটের এই পুরোনো কেন্দ্র (মেশিন) বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ আমলে। কারণ রিলায়েন্স ওই কেন্দ্র ভারতে বসাবে বলে ২-৩ বছর ফেলে রেখেছিল। কিন্তু ভারত সরকার কোনো গ্যাসের নিশ্চয়তা বা সরবরাহ না দেওয়ায় সেই কেন্দ্র চলে আসে বাংলাদেশে। এ কারণে এই কেন্দ্রে অন্যান্য নতুন কেন্দ্রের চেয়ে গ্যাস লাগে বেশি। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, সামিট এবং ইউনিকের মতো নতুন কেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহারের দক্ষতা ৫৬ শতাংশ হলেও জেরার কেন্দ্রে সেই দক্ষতা হচ্ছে ৫০ শতাংশ। কিন্তু নানা চাপের কারণে এখন এই কেন্দ্র চালু রাখতে হচ্ছে।

জেরার বাংলাদেশ প্রধান স্মিথতেস ভাডিয়া বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জেরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে চায় এবং সে কারণে এটি এ দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করেছে। তিনি বলেন, জেরার বিদ্যুৎকেন্দ্রে এডিবি, জাইকাসহ জাপানের বিভিন্ন ব্যাংকের ৬৪ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ আছে। জুলাইয়ে তাদের ঋণের কিস্তি শোধ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৭১৮ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিক্রির ব্যাপারে পিডিবির সঙ্গে চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরের পর রিলায়েন্স এটি জেরার কাছে বিক্রি করে চলে যায়। তিনি বলেন, জেরা গ্যাস খাতেও বিনিয়োগে আগ্রহী।