আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বহির্ভূত উৎস থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ক্রমবর্ধমান বাজেটের চাপ এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে নতুন উৎস থেকে আয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে এনবিআর বহির্ভূত উৎস থেকে মোট ৯১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৯.৫ শতাংশ বেশি।
এই লক্ষ্যের মধ্যে নন-ট্যাক্স রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সম্প্রতি অর্থ বিভাগ আয়োজিত বাজেট মনিটরিং ও রিসোর্স কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, সেই অনুপাতে রাজস্ব না বাড়লে সরকারকে ক্রমাগত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ কারণেই রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও চাপ রয়েছে। আইএমএফ চায়, বাংলাদেশ তার কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৯ শতাংশ থেকে ৯.২১ শতাংশে উন্নীত করুক।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বলতা রয়েছে। অতীতের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় নন-ট্যাক্স রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। একইভাবে নন-এনবিআর কর আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে নতুন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নন-ট্যাক্স রাজস্ব আদায় দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাতে আদায় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৫.৬৩ শতাংশ, যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৭০.৪৭ শতাংশ। এনবিআর বহির্ভূত কর আদায় ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গড়ে ৮০ শতাংশের বেশি অর্জিত হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা নেমে প্রায় ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তাই বড় রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব সংগ্রহে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, কর নেট বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং করবহির্ভূত রাজস্বের উৎস সম্প্রসারণ। বিশেষ করে ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ব্যবহার, ফি ও চার্জ পুনর্নির্ধারণ এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি পাওনা দ্রুত আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট প্রণয়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে কঠোর নজরদারি, সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি পাওনা আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে, যেখানে রাজস্ব আদায় দুর্বল। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে নন-ট্যাক্স রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে, যেখানে খাদ্যশস্য বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের আয় আশা করা হচ্ছে। একইভাবে সড়ক পরিবহন খাতে টোল ও ফি আদায় বাড়াতে আধুনিক পদ্ধতি চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নন-ট্যাক্স রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স ফি, জরিমানা, বাজেয়াপ্ত আমানত, বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়া, সরকারি যানবাহন ব্যবহারের ফি এবং টেন্ডারসহ বিভিন্ন নথি বিক্রির আয়। তবে এসব খাতে আদায়ের দক্ষতা এখনো সন্তোষজনক নয়। অর্থ বিভাগ এসব উৎস পুনর্মূল্যায়ন, বিস্তৃতি বাড়ানো এবং যৌক্তিক হারে ফি নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। অর্থসচিবের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে ছয় হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দুর্বল আদায় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষকে যানবাহন নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদে কঠোরতা বাড়ানো এবং টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা আধুনিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কাছে বকেয়া এক হাজার ২৮৫ কোটি টাকা আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের জন্য এক হাজার ৪২ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এই খাতে আদায় কমছে। তাই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু এবং রাজস্ব উৎস বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভাড়া আয় কমে যাওয়ায় নতুন উৎস, যেমন—হস্তান্তর ও নামজারি ফি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক আদায় পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ ছোট মন্ত্রণালয়গুলোকে পুরনো ফি কাঠামো হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনায় সেতু বিভাগে শাসনগত দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে, যেখানে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সরকারি ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে, কিছু চুক্তি ১৯৯৪ সাল থেকে ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজস্ব বাড়াতে কর ও নন-ট্যাক্স উভয় উৎসই সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং এনবিআর বহির্ভূত উৎস থেকে অন্তত এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব আসা উচিত।’ তিনি রাজস্ব আহরণে অদক্ষতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘কম দামে টোল-ভাড়া ইজারা দেওয়ায় সরকার আয় হারাচ্ছে। শুধু করের আওতা বাড়ানো নয়, নন-ট্যাক্স খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাও জরুরি। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।’